শ্বশুর ভুল জামাই সঠিক

0 ১২৩

১৯২০ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল না। এরপর নারীরা ভোট দেয়ার সুযোগ পেলেও প্রথম কোনো বড় দলের নারী প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেয়ার সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রবাসী পেয়েছিল ২০১৬ সালের ৮ই নভেম্বর। অর্থাৎ প্রায় ৯৬ বছর পর! সেদিন দেশটির দুই বড় দলের একটি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা। অনেকেই ভেবেছিলেন সে নির্বাচনে দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্টও পেয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তা আর হয়নি। জিততে জিততেও হেরে যান তিনি। প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে পপুলার ভোট অনেক বেশি পেলেও ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে হেরে যান হিলারি।

অন্যদিকে ১৯৮৪ সালে ডেমোক্রেট জেরাল্ডিন ফেরারো সর্বপ্রথম বড় কোনো দল থেকে নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। এরপর রিপাবলিকান সারাহ পালিন ২০০৮ সালে এবং ডেমোক্রেট কমালা হ্যারিস এবার নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন।

এবারও বিশ্বের সিংহভাগ মানুষ ভেবেছিলেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন এবং তার রানিং মেট কমালা হ্যারিস বিজয়ী হবেন। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ তা বলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ ২০১৬ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা। সে সময় নির্বাচনের আগে করা প্রায় সব জনমত জরিপে হিলারি এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনের পর ফল হয় উল্টো।

প্রায় দশক তিনেক আগে (১৯৯১ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ তার বই ‘মে ফ্লাওয়ার’-এ নিজের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি এই ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন, আগামী একশ’ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো নারী প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন না।

বইটির ২৮ এবং ২৯ নম্বর পৃষ্ঠায় হুমায়ূন লিখেছিলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে একজন মহিলা রাষ্ট্রপ্রধানের কথা চিন্তা করতে পারি। ভাবতে পারি। ওরা তা পারে না। আসছে একশ’ বছরেও এই আমেরিকায় কোনো মহিলা প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন না। অতি সুসভ্য এই দেশ তা হতে দেবে না।

আমি আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় যা বুঝেছি তা হলো, এদের সবার চিন্তা-ভাবনা সীমাবদ্ধ। বস্তুকেন্দ্রিক। একটি মেয়ের জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা হলো চিয়ার লিডার হবে। ফুটবল খেলার মাঠে স্কার্ট উঁচিয়ে নাচবে। স্কার্টের নিচে তার সুগঠিত পদযুগল দেখে দর্শকরা বিমোহিত হবে। এই তার সবচেয়ে বড় চাওয়া। একটি ছেলে চাইবে মিলিওনিয়ার হতে।

এই অতি সভ্য (?) দেশে আমি দেখি মেয়েদের কোনো সম্মান নেই। একজন মহিলাকে তারা দেখবে একজন উইম্যান হিসেবেই। একটি মেয়ের যে মাতৃরূপ আছে, যা আমরা সব সময় দেখি, ওরা তা দেখে না। একটি মেয়ে যতদিন পর্যন্ত শারীরিকভাবে আকর্ষণীয়, ততদিন পর্যন্তই তার কদর।

যা কিছু হাস্যকর, তার সবই এদের ভাষায় মেয়েলি, এফিমিনেট। শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, এই দেশে মেয়েরা একই যোগ্যতায় একই চাকরিতে পুরুষের চেয়ে কম বেতন পান। বিমানের ক্যাপ্টেন যদি মহিলা হন তাহলে বিমানের যাত্রীদের তা জানানো হয় না। ক্যাপ্টেন পুরুষ হলে তবেই শুধু বলা হয়- আমি অমুক, তোমাদের বিমানের ক্যাপ্টেন। মহিলা ক্যাপ্টেনের কথা বলা হয় না। কারণ, মহিলা বিমানের দায়িত্বে আছেন জানলেই যাত্রীরা বেঁকে বসতে পারেন। আমাদের দেশে মেয়েদের অবস্থা খারাপ, তবু একজন মহিলা ডাক্তার একজন পুরুষ ডাক্তারের মতোই বেতন পান। কম পান না।’

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে- হুমায়ূনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক হয়নি। একশ’ বছর নয়, তার করা ভবিষ্যৎবাণীর ২৫ বছরেই যুক্তরাষ্ট্র তার প্রথম নারী প্রেসিডেন্টকে (হিলারি) প্রায় নির্বাচিত করেই ফেলেছিল। আর ২৯ বছরে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্টকে (কমালা) নির্বাচিত করেই ফেলেছে!

কিন্তু শ্বশুরের (হুমায়ূন আহমেদ) ভবিষ্যদ্বাণী ভুল হলেও, ভুল হয়নি তার জামাতার (আসিফ নজরুল) ভবিষ্যদ্বাণী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ নজরুল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ঠিক আগের দিন (২রা নভেম্বর) পত্রিকার কলামে এবং নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভবিষ্যদ্বাণী করেন- এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেট প্রার্থী বিজয়ী হবেন।

তিনি লিখেছিলেন, “আমার এ আত্মবিশ্বাসের কারণ বিবিসি। বিবিসিতে ‘প্রেডিক্ট ইয়োর প্রেসিডেন্ট’ নামে একটা গেম আছে। সেখানে বিবিসি নানা বিবেচনায় ব্যাটল গ্রাউন্ড স্টেট হিসেবে সাতটি রাজ্য বাছাই করেছে, যেখানকার ফলাফল নির্ধারণ করবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হারজিৎ।”

বিবিসি’র জটিল হিসাবের মারপ্যাঁচ ব্যাখ্যা করে শেষে তিনি উপসংহার টানেন, ‘অর্থাৎ জিতবেন বাইডেন। এত বড় গলায় এটি বললাম অনেকটা বিবিসি’র ওপর নির্ভর করে। এটা না হলে বিবিসি’র দোষ। হলে কিছুটা আমারও কৃতিত্ব! কারণ, ভবিষ্যদ্বাণীটা আমার। অতিমারি, অভাবিত মন্দা, জাতিগত বিভেদের এমন অভূতপূর্ণ পরিবেশের নির্বাচনে কয়জনের সাহস আছে, এমন ভবিষ্যদ্বাণী করার!’

আগেই লিখেছি, ২০১৬ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এবার অনেক ঝানু বিশ্লেষকও কে জিতবেন তার ভবিষ্যদ্বাণী করার সাহস পাচ্ছিলেন না। আসিফ নজরুল সে সাহস দেখিয়েছিলেন এবং তার সাহসিকতার জয় হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন ছিল ১৩ই নভেম্বর। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তার রচিত ‘মে ফ্লাওয়ার’- বইয়ের একেবারে শেষের লাইনগুলো তুলে ধরছি যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে পছন্দ না করলেও দেশটির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধে জানিয়ে এবং দেশটির বিজয় কামনা করে তিনি লিখেছিলেন:

“গভীর আবেগে চোখে পানি এসে গেল। কত না পূর্ণিমার রাত মুগ্ধ চোখে এই চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিস্ময় ও আবেগে অভিভূত হয়েছি। সেই চাঁদ আজ স্পর্শ করলাম। আমার এই মানবজীবন ধন্য। আমেরিকার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধে মন দ্রবীভূত হলো। আমেরিকানদের অনেক দোষ-ত্রুটি, তবু তো এরা আমাকে এবং আমার মতো আরো অসংখ্য মানুষকে রোমাঞ্চ ও আবেগে অভিভূত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ধরাছোঁয়ার বাইরের যে চাঁদ, তাকে নিয়ে এসেছে মাটির পৃথিবীতে। এই শতক শেষ হওয়ার আগেই তারা যাত্রা করবে মঙ্গল গ্রহের দিকে। সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে আবারো অভিভূত করবে। আমেরিকা আমি পছন্দ করি না। তবু চন্দ্রশিলায় হাত রেখে মনে মনে বললাম- তোমার জয় হোক।”উৎসঃ   মানবজমিন

Comments
Loading...