নামের ভার ভোটের বাক্সে পড়েনি : ড. কামালের

0 ৩৭

ড. কামাল হোসেন, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, আ স ম আবদুর রব। ছোট দলের হেভিওয়েট নেতা। দুই দলকেই নানা পরামর্শ দেন কীভাবে দেশ চালাতে হবে, কী করতে হবে, কী করা উচিত নয়। তবে জনগণের মন কীভাবে জয় করতে হবে, সেই কৌশলটা এখনো রপ্ত করতে পারেননি।

এর প্রমাণও নানা সময় মিলেছে নির্বাচনে। পত্রিকার পাতায় যত স্তুতি, ভোটের বাক্স ততই ফাঁকা। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি থেকে বেরিয়ে কামাল হোসেন আর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর জামানত বাজেয়াপ্তের বাইরে অর্জন নেই। একদা আ স ম আবদুর রব তার নিজের এলাকা লক্ষ্মীপুরের একটি আসন থেকে লড়াই করার মতো ভোট পেলেও এখন আওয়ামী লীগ আর বিএনপির প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দূর থেকে দেখেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম সংগঠনের আলোচিত নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না মূলধারার রাজনীতিতে বলার মতো অবস্থান গড়তে পারেননি। মাঝে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে বগুড়ার শিবগঞ্জ আসনে নৌকা মার্কায় মনোনয়ন পেয়েও লাভ হয়নি। বিপুল ভোটে হেরেছেন দুইবারই।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় সামরিক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থানের অভিযোগে দলে গুরুত্ব হারান মান্না, মনোনয়ন জোটেনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে। পরে নিজেই দুই নেত্রীর বাইরে গিয়ে তৃতীয় শক্তি হওয়ার বাসনায় গড়েন নাগরিক ঐক্য। কিন্তু তৃতীয় শক্তি হতে পেরেছেন এমন কোনো নমুনাই নেই।

এর মধ্যে বি. চৌধুরী, রব এবং মান্না মিলে গত বছরের শেষ দিকে গড়ে তোলেন যুক্তফ্রন্ট, তাও তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণায়।

 

নিজেদের ঘোষণার বাইরে গিয়ে তারাই আবার এখন বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়ার চেষ্টায় আছেন যদিও মান্নার ফেসবুক পেজে দুই নেত্রীর হাতে দেশ নিরাপদ নয় বলে ঘোষণা দেওয়া আছে।

বাংলাদেশে তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘কিংস পার্টি’ নামে পরিচিতি পাওয়া বেশ কিছু দলের নেতার বাসনা ছিল তৃতীয় শক্তি হওয়ার। এদের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহীম এরই মধ্যে রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। আর বিএনপির শক্তি ব্যবহারের বাসনায় আছেন কামাল হোসেন, বি. চৌধুরী, আ স ম রব, মান্নারা।

 

প্রশ্ন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কী হবে? জনগণের মন জয় করতে পারবে যুক্তফ্রন্ট? ভোটাররা কি আদৌ আস্থা রাখবেন তাদের ওপর?

যুক্তফ্রন্টের উদ্যোক্তারা চাইছেন বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়তে। এই ঐক্য হলে যুক্তফ্রন্ট নেতাদের অবস্থান কী হবে?

এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপি। যুক্তফ্রন্টকে ক্ষমতাসীন দল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করে এমনও না। শেখ হাসিনা সরাসরি তাদেরকে ‘শূন্য’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘শূন্য যোগ শূন্য, শূন্য।’

তবে যুক্তফ্রন্ট নেতারা তা মনে করছেন না। তারা বিএনপির কাছে এমন সব দাবি তুলছেন বা তুলতে চাইছেন তা রীতিমতো হাস্যরস তৈরি করছে। বিএনপিকে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫০টি ছেড়ে দিতে হবে, এমন প্রস্তাব সরাসরিই দেওয়া হয়েছে। আবার মান্না বলেছেন, ক্ষমতায় আসতে পারলে দুই বছর তাদেরকেই দেশ চালাতে দিতে হবে। অর্থাৎ বিএনপির অবস্থান থাকবে জোটে গৌণ।

বিএনপির নেতারা ক্ষুব্ধ, কিন্তু বাস্তবতার বিবেচনায় প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টায় ২০টি দল নিয়ে গড়া মোর্চার পাশাপাশি তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা দিয়ে কাজ করা যুক্তফ্রন্ট আর গণফোরাম নেতা কামাল হোসেনের সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি যাকে দলটি ‘জাতীয় ঐক্য’বলছে।

 

দুই দিন আগে রাজধানীতে এক আলোচনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে ছাড় দেয়ার বিষয়ে তার দলের সিদ্ধান্তের কথা জানালেও আপত্তি জানিয়েছিল শরিক দল এলডিপি। কারণ হিসাবে যাদের সঙ্গে বিএনপি ঐক্যের কথা বলছে তাদের জনবিচ্ছিন্ন বলছে দলটি। এলডিপির প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও গতকাল ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে ছাড় দেয়ার বিষয়ে বিএনপির পরিকল্পনায় সায় দিয়েছে শরিকরা।

বিএনপি জোট যাদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যে গড়তে চাচ্ছে তাদের একজন ড. কামাল। যুবক বয়সেই আইনজীবী হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন কামাল হোসেন। নজরে আসেন বঙ্গবন্ধুর। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সম্পদ হবেন। সেই ভাবনা থেকে স্বাধীন দেশে ঠাঁই দেন মন্ত্রিসভায়।

 

মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৭২ সালে প্রণীত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতে ছিলেন কামাল হোসেনও।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া একটি আসনে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় জিতে সংসদ সদস্য হন ড. কামাল হোসেন। এবার তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেন বঙ্গবন্ধু। পরের বছর দায়িত্ব দেওয়া হয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। ব্যস, এ পর্যন্তই। এরপর আর রাজনৈতিক অর্জন নেই তার।

বঙ্গবন্ধু তাকে নিজের হাতে ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দিয়েছিলেন বলেই বাহাত্তরের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম হিসেবে তিনি আজও সম্মানিত। কিন্তু ১৯৭৫ সাল পরবর্তী রাজনীতিতে তার উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান নেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে চারজনকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছে কেন্দ্রীয় কারাগারে, কাউকে কাউকে বন্দুকের নলে ভয়ভীতি দেখিয়ে রাখা হয়েছে নিষ্ক্রিয়। তবে ড. কামাল হোসেন চাপে পড়েননি।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের হয়ে কামাল হোসেন ভোট পান সবে ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে বিজয়ী বিএনপির আবদুস সাত্তারের বাক্সে পড়ে ৬৫ শতাংশ ভোট।

১৯৯১ সালে ঢাকার মিরপুর আসনে কামাল হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু বিএনপির প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যান। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়েন। ১৯৯২ সালে নিজেই রাজনৈতিক দল গণফোরাম গঠন করেন।নির্বাচনের প্রতীক হয় উদীয়মান সূর্য। এই প্রতীক নিয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেয় গণফোরাম। ১০৪টি আসনে (৭ম সর্বোচ্চ) প্রার্থী দেয় দলটি। প্রতিটি আসনেই ভরাডুবি হয়, জামানতের টাকা ফেরত পাননি কামাল হোসেনসহ কেউ।

গণফোরামের প্রার্থীরা বরিশাল বিভাগে মোট ভোট পেয়েছিল এক হাজার ৮২৯টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ভোট পেয়েছিল আট হাজার ৬৪০টি, ঢাকা বিভাগে ভোট পেয়েছিল ২২ হাজার ৬২৩টি, খুলনা বিভাগে ভোট পেয়েছিল এক হাজার ৫৬৫টি, রাজশাহী বিভাগে ভোট পেয়েছিল ১২ হাজার ১৭টি এবং সিলেট বিভাগে ভোট পায় সাত হাজার ৫৭৬টি।

সর্বমোট ভোট পড়েছিল ৫৪ হাজার ২৫০টি। মোট ভোটারের বিপরীতে দশমিক শূন্য নয় পাঁচ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছিল কামাল হোসেনে২০০১ সালের নির্বাচনে ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর আসন থেকে ছয় হাজার ১৮৭ ভোট পেয়ে জামানত হারানোর পর জনতার মন জয়ের লড়াইয়ে ক্ষ্যান্ত দেন ড. কামাল।

তবে ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা জারির পর ওই সরকারের পক্ষে উচ্চ আদালতে আইনি যুক্তি দেন কামাল হোসেন। তার ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি ’র তত্ত্ব তখন বেশ আলোচিত হয়। সাংবিধানিক গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেও ছদ্ম সেনা শাসনের একটি সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ব্যাখ্যা কখনো দেননি তিনি। আর ওই আমলে তিনি কালো টাকা জরিমানা দিয়ে সাদা করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়।

বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনের সময় আওয়ামী লীগ যে মহাজোট গড়ে তুলেছিল, সেখানে কামাল হোসেনও যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের পল্টন ময়দানের জনসভায়। তবে জরুরি অবস্থা জারির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে তার দৌড়ঝাঁপের পর মহাজোটে আর তাকে রাখেনি আওয়ামী লীগ। রাজনীতিতে আরো একটু ছিটকে যান তিনি।

এর মধ্যে কামাল হোসেনকে ঘিরে গত জুলাই মাস থেকেই হঠাৎ আক্রমণ চলতে থাকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। ভোটের রাজনীতিতে অবস্থান করে নিতে ব্যর্থ হওয়া একজন নেতাকে ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের এই আক্রমণের কারণ ব্যাখ্যা করেননি নেতারা। তবে গণফোরাম নেতাকে ঘিরে কিছু একটা চক্রান্ত চলছে এই কথা বলে যাচ্ছেন তারা।

এর মধ্যে কামাল হোসেনের সঙ্গে ঐক্যের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। আর পাল্টা প্রস্তাব হিসেবে জামায়াত ত্যাগের দাবি জানিয়েছেন গণফোরাম নেতআবার যুক্তফ্রন্ট বহু সমঝোতা বৈঠক করে এক ধরনের সমঝোতায় আসতে পেরেছে এই আইনজীবীর সঙ্গে। এখন একসঙ্গে এগুবে দুই পক্ষ। বিএনপির সঙ্গে ঐক্য হবে কি না সেটা এখন আলোচনার তুঙ্গে।

Comments
Loading...