হেফাজতের বিক্ষোভ, বাবুনগরীর হুঁশিয়ারি

0 ৭৮

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে হেফাজতে ইসলাম। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী জুমার নামাজের পর দেশজুড়ে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বিক্ষোভে হেফাজতের আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, এই দেশ মুসলিম প্রধান দেশ। এ দেশের পুলিশ গুলি করে নিরীহ মুসলমান হত্যা করবে, এটি বরদাশত করা যায় না। দোষীদের তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। রাজধানীতে বায়তুল মোকাররমে সমাবেশে হেফাজতের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব। তিনি বলেন, আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

সেখানে কোনো পুরুষ ঘরে থাকতে পারছে না। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। আবার যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারের লোকজনদের হয়রানি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মামলা হলো, এতো মানুষ গ্রেপ্তার হলো কিন্তু প্রকৃত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হলো না। যিনি মাদ্রাসায় হামলা করলেন, সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ককটেল মারলেন, গুলি করে মানুষ হত্যা করলেন, তাদের কিছুই হচ্ছে না। স্থানীয় এমপি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও তার বাহিনী ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। আমরা তাদের গ্রেপ্তার চাই।
করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে মাদ্রাসা বন্ধের পাঁয়তারা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত রমজানের মতো তারাবি ও নামাজ বন্ধের পাঁয়তারা চলছে। এ দফায় এমন করা হলে কঠোর আন্দোলন হবে। ধর্মপ্রাণদের ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মুহাম্মাদ মামুনুল হক। তিনি বলেন, দেশব্যাপী হেফাজত ইসলামের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। কেউ যদি চিন্তা করেন, বন্দুকের নল দিয়ে হেফাজত ইসলামকে শান্ত করে ফেলবেন তাদের বলবো, আপনারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আমি বিশ্ব মানবাধিকার কর্মীদের কাছে বলতে চাই, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বলতে চাই- যথাযথ তদন্ত করুন। পুলিশি হেফাজতে থাকা আমার কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। আমরা এসব হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাই। যারা আমাদের ওপর হামলা করেছে তারা কীভাবে এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমি তার জবাব চাই।
তিনি আরো বলেন, মাদ্রাসা থেকে ছুরি উদ্ধার করা হলো। এগুলো কিসের ছুরি সবাই জানি। দেশে কোরবানি হয়। এই কোরবানির কাটাকাটির জন্য এই ছুরিগুলো ছিল। এগুলো নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নাই। মাদ্রাসা থেকে ছুরি উদ্ধার করে ছাত্রদের সন্ত্রাসী বানাতে চাচ্ছে। যেগুলো না হলে দেশের পশুপাখির গোশত হালালভাবে খেতে পারতেন না।
মিডিয়াগুলোর আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, যথাযথ ঘটনা তুলে ধরা আপনাদের দায়িত্ব। আর ভুলক্রমে সাংবাদিকদের ওপর হেফাজতের কিছু কর্মী হামলা করে থাকতে পারে। আমরা এজন্য কেন্দ্রীয়ভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
মামুনুল হক বলেন, অপপ্রচার চালিয়ে হেফাজতকে রুখতে পারবেন না। হেফাজত কারও পক্ষে নয়। দেশের প্রয়োজনে, ইসলামের প্রয়োজনে হেফাজত মাঠে রয়েছে, থাকবে। তিনদিনে ২০ জন শহীদ হয়েছেন। প্রয়োজনে আরো রক্ত দেবো।
হেফাজতের সহকারী মহাসচিব সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ভারতের মান রক্ষায় ২০ জন ভাইকে শহীদ করা হয়েছে। ৫০ বছর আগে পাকিস্তানি শাসকরা প্রাণ নিয়েছে। এখন ভারতীয় বাহিনীর জন্য রক্তে রঞ্জিত হলো বাংলাদেশ। নরেন্দ্র মোদিকে সুরক্ষিত রাখতে বাঙালির তাজাপ্রাণ কেড়ে নেয়া হলো।
কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী বলেন, হেফাজতের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করতে মসজিদ-মাদ্রাসায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইজিপিকে বলবো, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছে আওয়ামী লীগের হেলমেট বাহিনী, তাদের গ্রেপ্তার করুন। তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আপনারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করুন। মিডিয়ালীগ হবেন না।
অধ্যাপক ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, পুলিশ গুলি করে হেফাজতের নেতাকর্মীদের শহীদ করেছে। শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। তারা মোদির বিরোধিতা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। আর যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হেলমেট বাহিনী মোদিকে রক্ষায় মাঠে নেমেছে।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, আহমদ আলী কাসেমী, জসিম উদ্দিন, মুজিবুর রহমান হামিদী, সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, আতাউল্লাহ আমিন প্রমুখ।
রাজধানীর এই বিক্ষোভ ঘিরে সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সমাবেশ ঘিরে দুপুর থেকেই মসজিদের উত্তর গেটের ভেতরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান নেয়। এ ছাড়াও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি চোখে পড়ে পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলা মোড় ও এর আশেপাশের এলাকায়। এ ছাড়াও র‌্যাপিড অ্যাশকন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তবে কোনো ধরনের সংঘাত সংঘর্ষ হয়নি এই বিক্ষোভে। বিক্ষোভে অংশ নেয়া নেতাকর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখেন সমাবেশ স্থল।
‘শান্তি বজায় রাখতে প্রশাসন ব্যর্থ’
হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালিয়ে প্রশাসন শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। গতকাল হাটহাজারীতে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ পরবর্তী সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন। জুমার নামাজের পর হাটহাজারী ডাকবাংলো চত্বরে বেলা ২টায় হেফাজতে ইসলামের উপজেলা সভাপতি শোয়াইব জমিরির সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনি বলেন, আমার মনের আগুন যদি ছেড়ে দেই তাহলে গোটা বাংলাদেশে আগুন জ্বলবে। নরেন্দ্র মোদি, যার কথা আমি সবচেয়ে বেশি বলেছি আপনাদেরকে আগে থেকে। বিগত কয়েক বছর আগে আহমেদাবাদের মুসলমানদেরকে কচু আর গাজরের মতো কেটেছে এই মোদি। তার হাত কাশ্মীরের মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত। মোদি আল্লাহর ঘর মসজিদ, বাবরি মসজিদকে ধ্বংস করে রামমন্দির নির্মাণ করছে।
বাবুনগরী বলেন, আমাদের বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী এটা পবিত্র দিন। এই পবিত্র দিনকে নাপাক করেছে, অপবিত্র করেছে মোদি। এটা একটা পবিত্র দিন মনে করি আমরা। বঙ্গবন্ধুর জন্য দোয়া করি আমরা। জুমার খুতবায় বাংলাদেশের জন্য আমরা দোয়া করি। আমরা স্বাধীনতার বিরোধী নই। আমরা দেশ বিরোধী নই। আমরা সরকার বিরোধী নই। যারা মুসলমানদের শত্রু, আল্লাহ-রাসুলের শত্রু, আল্লাহর দুশমন, যারা কোরআনে হাফেজকে বিনা উস্কানিতে, নির্বিচারে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে ওরাই নাস্তিক। ওরাই সন্ত্রাসী। ওদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন চলবে।
হেফাজতের আমীর আরো বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম। এটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। স্বাধীন রাষ্ট্রে দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করা, মিছিল-মিটিং করার একশ’ পার্সেন্ট স্বাধীনতা আমাদের আছে। কিন্তু মোদির আগমনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রদের ওপর গুলি করার কোনো অধিকার প্রশাসনের নেই। কোনো ওসি যদি এর অর্ডার দিয়ে থাকে, তাহলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে। সেই ওসি এখানে থাকতে পারে না।
জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, কি দোষ করলাম আমরা? আমাদের ছাত্র ভাইয়েরা কি দোষ করলো? কি অপরাধ তাদের? থানায় যারা ইটপাটকেল মেরেছে তারা যে আমার ছাত্র তার প্রমাণ কি? সেখানে তো আরো অনেক লোক ছিল। রাস্তায় এসে ছাত্রদেরকে পুলিশ কেন গুলি করলো? এগুলো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এগুলোর দাঁতভাঙা নয়, মাড়ি ভাঙা জবাব দেবো ইনশাআল্লাহ। যাদের নামে মিথ্যা মামলা হয়েছে, অনতিবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। যাদের গ্রেপ্তার করেছে তাদেরকে বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে। যারা শহীদ হয়েছে, যারা আহত হয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
বিক্ষোভ সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম হাটহাজারী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন, যুগ্ম সম্পাদক মাওলানা এমরান সিকদার ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা কামরুল ইসলাম এর যৌথ সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস, কেন্দ্রীয় সহ-অর্থ সম্পাদক আহসান উল্লাহ, কেন্দ্রীয় সহ-ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক মাওলানা জুনাইদ বিন ইয়াহইয়া।
বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলাম হাটহাজারী পৌর শাখার সভাপতি মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম মেহেদী, সহ-সভাপতি মাওলানা হাফেজ আলী আকবর, হাটহাজারী উপজেলা সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল্লাহ, পৌর সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ, হেফাজত আমীরের ব্যক্তিগত সহকারী ও হাটহাজারী উপজেলা শাখার সহ-প্রচার সম্পাদক মাওলানা ইনআমুল হাসান ফারুকী, মাওলানা সোহাইল চৌধুরী, মাওলানা হাফেজ আব্দুল মাবুদ, মাওলানা নজরুল ইসলাম, মাওলানা হাবিব উল্লাহ হাবিব প্রমুখ।

mzamin

Comments
Loading...