হারাম্বে প্রথা চালু করুন

0 ২১

Atithiআলী ইদ্‌রিস : হারাম্বে সোয়াহিলি ভাষার একটি শব্দ যার অর্থ ‘যা কিছু পাও এক ঝুড়িতে ভরো’ অথবা ‘দশের লাঠি একের বোঝা’। প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াত্তার শাসনকালে ১০ বছর (১৯৮১-১৯৯০) কেনিয়াতে চাকরি জীবন কাটিয়েছি। বৃটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতালাভের পর কেনিয়ানরা বিলাসী জীবনযাপন বেছে নিয়েছিল। কেনিয়ার আয়তন বাংলাদেশের প্রায় ১০ গুণ, কিন্তু লোকসংখ্যা তখন ছিল মাত্র এক কোটি।  এজন্য কৃষিকাজের উপযোগী প্রচুর জমি পড়ে আছে, পাড়াগাঁয়ের লোকরা বসতবাড়ির আশপাশে ভুট্টা, কলা, তরিতরকারি ফলিয়ে আর পশুপাখি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। শিক্ষিত শহরবাসীর বেশির ভাগ চাকরিজীবী, আর কিছু সংখ্যক বিত্তবান কেনিয়ান স্থাবর সম্পত্তি, কফি ও সাইসল ফার্মের মালিক। কেনিয়ানদের জীবনে হারাম্বে প্রথা ওই দেশকে অর্থনৈতিক উন্নতি দান করেছে। আফ্রিকার আরও কিছু দেশে হারাম্বে প্রথা চালু আছে।  সরকারি, বেসরকারি, শহর, গ্রাম, ব্যক্তি গোষ্ঠী নির্বিশেষে হারাম্বেকে ওরা উৎসবের মতো পালন করে। একদিন এক সহকর্মী পাঁচ তারা হোটেলে ডিনারের দাওয়াত দিলেন। কার্ডে খেলা ছিল ডিনার ও হারাম্বে মিটিং। ডিনার পরিবেশনের পর  অন্য এক সহকর্মী হারাম্বের উদ্দেশ্য নিয়ে বক্তব্য রাখলেন । সহকর্মীর ছেলের বিদেশে লেখাপড়ার জন্য ফান্ড দরকার। সবার পার্স থেকে বড় বড় নোট বেরিয়ে আসতে লাগলো। সবার অনুদান যোগ করে প্রায় পাঁচ লাখ শিলিং দাঁড়ালো। খবরের কাগজে প্রতিদিন বেরোয় দেশের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী, সচিব, কোম্পানি ও ব্যাংকের চেয়ারম্যান অথবা স্থানীয় মোড়লের সভাপতিত্বে হারাম্বে সভার খবর। গির্জা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কালভার্ট, ব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণের জন্য এসব হারাম্বে সভায় মিলিয়ন থেকে বিলিয়ন শিলিং পরিমাণ ফান্ড জমা পড়ে। গ্রামে গঞ্জে হারাম্বে সভায় শুধু নগদ অর্থ নয় উপস্থিত পুরুষ-মহিলারা যার যার সাধ্যমতো গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি, ক্ষেতের ফসল পর্যন্ত দান করে দেয়। মোড়ল, মন্ত্রী, এমপিরা নিজ নিজ এলাকায় প্রকল্প চিহ্নিত করে তা অর্থায়নের জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমোদন কামনা করেন । অতঃপর প্রেসিডেন্ট নিজে বা মন্ত্রী, এমপিদের দ্বারা হারাম্বে মিটিং ডাকার আদেশ দেন।  মিটিংয়ের তারিখ নির্ধারিত হলে এলাকায় উৎসবের আমেজে হৈচৈ পড়ে যায়। নিঃস্বার্থে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এলাকার মানুষ ওইসব মিটিংয়ে যোগ দেয়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জনগণ নিজ নিজ দানের অর্থ, চেক, পণ্য সমর্পণ করে এবং সভাপতি হাততালির মাধ্যমে দাতার নাম ও দানের পরিমাণ ঘোষণা করেন। জনতার এ পবিত্র বদান্যতার দৃশ্য দেখার মতো। উপস্থিত দর্শক-শ্রোতার মধ্যে কদাচিৎ দু’-একজন হয়তো কেটে পড়ে, বাকি সবাই তহবিল সংগ্রহে অংশ নেয়। আমাদের দেশে ইদানীং ‘লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত’ প্রকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে বড় বড় কোম্পানির মালিকগণ কোটি কোটি টাকা অনুদান দিলেন। এ রকম অনেক প্রকল্পের জন্য  অনুদানের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা যায়। এলাকার প্রকল্প হলে এলাকার মন্ত্রী বা সাংসদ এ সব মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করতে পারেন এবং নিজে বড় অংকের দান ঘোষণা করে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাতে পারেন। এভাবে দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতুর জন্যও দাতাদের মুখের দিকে না তাকিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আদেশে  রাজধানী ও প্রতিটি জেলায় বড় পরিসরে তহবিল-সংগ্রহ মিটিং ডাকা যেতে পারে। রাজধানীর প্রতিটি ব্যাংক, বীমা, গার্মেন্ট, উৎপাদনকারী ও অন্যান্য কোম্পানি, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, এনজিও এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে দাওয়াত করে পদ্মা সেতুর অনুদান-মিটিং ডাকা যেতে  পারে। স্থান সংকুলান না হলে পর্যায়ক্রমে দু’তিনটি মিটিং করে দু’-তিন হাজার কোম্পানি, সংস্থা থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার আয়কর-মুক্ত অনুদান ওঠানো যেতে পারে। একই ভাবে প্রতিটি জেলায় মন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট সাংসদের নেতৃত্বে সম্ভাব্য দাতাদের নিকট থেকে হাজার কোটি টাকা অনুদান সংগ্রহ করা যেতে পারে। আফ্রিকানদের হারাম্বে প্রথায় রাজনীতির প্রতিবন্ধকতা নেই, কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি ও বিরোধী দলের কোন্দলে অনেকে অসহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পে দাতা তালিকায় নিজের নাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হলেও অনেক দাতা এগিয়ে আসতে পারেন। আফ্রিকার হারাম্বে প্রথা এ দেশে চালু  হলে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতার ওপর মুখাপেক্ষিতা কমবে, বিনা সুদে অনুদান পাওয়া যাবে, দেশের অবকাঠামোতে ত্বরিত উন্নয়ন ঘটবে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে।

Comments
Loading...