‘বাঘ’কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নেওয়ার আকুতি গাড়ি উদ্যোক্তার

0

দেশীয় ব্যবস্থাপনায় অ্যাপভিত্তিক পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার (তিন চাকার বাহন) তৈরি করেছে বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পির স্বপ্ন, একদিন দেশের পাশাপাশি ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন সড়কে দাপিয়ে বেড়াবে এই গাড়ি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে পারছেন না তিনি। তাই বাঘ’কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন এই উদ্যোক্তা। তার চাওয়া, ‘প্রধানমন্ত্রী একবারের জন্য হলেও এই গাড়ি দেখবেন, এই গাড়িতে উঠবেন।’

ঢাকার গাজীপুরে কারখানা স্থাপন করে ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু গাড়ি তৈরি হয়েছে। ইকো-ট্যাক্সিটির নাম ‘বাঘ’ পরিবহন। তিন বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের বিভিন্ন দফতরে ধরনা দিয়েও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা গাড়িটি সড়কে আনতে পারেনি বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেড। সেই স্বপ্ন যেন আটকে আছে অদৃশ্য কোনও সুতায়।

বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি জানান, তিন চাকার এই ইকোট্যাক্সিতে থাকছে অত্যাধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা। তার আশা, ‘বাঘ’কে নিবন্ধনের আওতায় আনলে ফি বাবদ সরকার প্রতি বছর সাড়ে ৫০০-৬০০ কোটি টাকা আয় করতে পারবে।

দেশের অভ্যন্তরে স্বস্তিদায়ক যাত্রীসেবার পাশাপাশি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই বাহন রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। উদ্যোক্তা উল্লেখ করেন, ‘বাঘ’ রফতানির ব্যাপারে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কম্বোডিয়া, সুদান, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইথিওপিয়া এটি নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পির দাবি, ‘আমার এই প্রচেষ্টার জন্য সারা পৃথিবী সাধুবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছেই পৌঁছাতে পারছি না। এ কারণে আমার স্বপ্ন আটকে আছে। আমি মনে করি, আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ জরুরি। তিনি একবার গাড়িটা দেখলে, একবার এই গাড়িতে চড়লে আমার আর কিছুই চাওয়া বা পাওয়ার থাকবে না।’

‘বাঘ’ বানাতে গিয়ে কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি জানতে পারেন, বাংলাদেশে গাড়ি তৈরির কোনও পলিসি নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও দেশে কোনও গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠান হয়নি। তার গর্ব, ‘৫০ বছর পর হলেও আমার হাত ধরে গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হয়েছে দেশে। কিন্তু আমার স্বপ্ন পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বুয়েটে তিন মাস ধরে পরীক্ষা চলছে। সেখানে সুইমিং পুলে নামিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ১১ মাস ধরে অবিরাম পরীক্ষা চলছে। ভালো কিছু করেছি বলেই ১১ মাস ধরে পরীক্ষার মধ্যেও টিকে আছি।’

কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পির দাবি, ‘বাঘ’ হবে বিশ্বের প্রথম অ্যাপভিত্তিক গাড়ি প্রতিষ্ঠান। কারণ উবার, পাঠাওসহ রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোর খুব একটা নিজস্ব গাড়ি থাকে না।

কী কী সুবিধা দেবে ‘বাঘ’? উদ্যোক্তা জানান, অ্যাপভিত্তিক এই গাড়িতে চালকসহ সাতজন বসতে পারবে। এছাড়া ওয়াইফাই, জিপিএস, টেলিভিশন, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা, ইন্টারনেট সুবিধা থাকছে এতে। ভাড়া মেটাতে ব্যবহার করা যাবে এটিএম কার্ডসহ যেকোনও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ। এতে তুলনামূলক বড় আকারের চাকার ব্যবহার হওয়ায় দুর্ঘটনা কমবে।

বিশ্বের ৭০ ভাগ থ্রি হুইলার রফতানি করে বাজাজ। কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পির মন্তব্য, “বাজাজ যেটা করে না, আমরা সেটা করতে চাই। সেজন্য ‘বাঘ’ নিয়ে আসছি। এতে বসে টিভিও দেখা যাবে। ২০ লাখ মানুষকে সেবা দেবে এই গাড়ি। এটি মানুষকে শিক্ষিত হতেও সহায়তা করবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের শতভাগ প্রতিফলন দেখা যাবে এতে।”

উন্নত মানসম্পন্ন স্টিলের কাঠামোর ব্যবহারের ফলে ‘বাঘ’ অন্য গাড়ির তুলনায় বেশি টেকসই থাকবে। দেশে বড় গাড়ির জন্য যে স্টিল ব্যবহৃত হয় তা দিয়েই তৈরি হবে ‘বাঘ’। ফলে দুর্ঘটনায় সিএনজি অটোরিকশাকে যেভাবে দুমড়েমুচড়ে যেতে দেখা যায়, এর বেলায় তেমনটি হবে না।

কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি।

প্রতিটি ‘বাঘ’ গাড়িতে বিকল্প হিসেবে থাকছে সোলার চার্জিং সিস্টেম। সোয়াপ (ব্যাটারির আলাদা চার্জ ব্যবস্থা) ব্যাটারি হওয়ায় চার্জের জন্য বাহনটিকে থেমে থাকতে হবে না। একবার চার্জে এটি ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলবে। ‘বাঘ’-এ থাকবে উন্নতমানের লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। এর ব্যাটারি ও চার্জারে থাকবে মাইক্রোচিপ। যাতে একটি অ্যাপ প্রিলোডেড থাকবে (বিল্টইন)।

কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি মনে করেন, অ্যাসিড ব্যাটারির সংস্পর্শে যারা থাকছেন, তাদের অধিকাংশেরই ১০ বছরের মধ্যে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনুমতি পেলে বড় পরিসরে দেশীয় ব্র্যান্ড ‘বাঘ’ উৎপাদন শুরুর ইচ্ছে পোষণ করেন উদ্যোক্তা। তার আশা, অনুমতি পেলে এর মাধ্যমে একদিকে যাত্রীদের খরচ কমবে, অন্যদিকে সরকার প্রতিবছর অন্তত ১০-১২ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব পেতে পারে। কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি এর ব্যাখ্যা দিলেন, ‘পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে বছরে অন্তত ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল কমানো সম্ভব। অন্যদিকে প্রচলিত ইজিবাইক বন্ধ হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কার্বন ক্রেডিটের জন্য অতিরিক্ত আরও ৩ হাজার কোটি টাকা পাওয়া সম্ভব। প্রতিটি প্রচলিত ইজিবাইক বন্ধ হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কার্বন ক্রেডিটের জন্য সরকার ১৫ ডলার করে পাবে। ২০ লাখ ইজিবাইক বন্ধ হলে আসবে ৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া প্রচলিত ইজিবাইক নিবন্ধন ছাড়াই চলে, এগুলোর রোড পারমিট নেই। তাই কোনও রাজস্ব পায় না সরকার।’

রাস্তায় যেসব ইজিবাইক চলছে, তাতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এসিড ব্যাটারি ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পির। তার মন্তব্য, সরকার নীতিমালা দিলে প্রচলিত ইজিবাইক রিসাইকেল করা যায়। এরপর এগুলো পরিবেশবান্ধব করে অ্যাপের মাধ্যমে চালানো সম্ভব। তিনি বলেন, ‘১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করে কেনা ইজিবাইক তো ফেলে দেওয়া যাবে না। যেহেতু অ্যাপের মাধ্যমে চলবে, সেহেতু আমরা এগুলোকে পণ্য ডেলিভারির কাজেও ব্যবহার করতে পারবো।’

কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পির আশা, ‘বাঘ’ উৎপাদনে প্রয়োজনে আরও ১২-১৫টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এছাড়া ইজিবাইকের ২০ লাখ মানুষের পাশাপাশি বাঘ তৈরিতে সম্পৃক্ত আরও অন্তত ১০ লাখ অর্থাৎ ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সরাসরি বাঘ উৎপাদনে সম্পৃক্ত অন্তত ১ হাজার ২০০ মানুষ চাকরি পাবেন।

বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের সভাপতি মনে করেন, ট্রাককে পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব। তার কথায়, ‘এই খাতে বিনিয়োগের জন্য আমেরিকানরা আসতে চায়। তাদের প্রযুক্তি আর আমাদের প্ল্যাটফর্ম ও শ্রমিকরা এই খাতে বড় বিপ্লব ঘটাতে পারে।’

আশার পাশাপাশি আক্ষেপের কথাও শোনালেন কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি, “আমরা এমন একটি দেশে বসবাস করছি, যেখানে একবছরের চেষ্টায়ও ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় না। যদিও আমার পরে এসেও দুই-তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো তৈরি করে ফেলেছে। কিন্তু আমি ৩৮ মাস আগে শুরু করেও ব্যাংক ঋণ পাচ্ছি না। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা গাড়ি তৈরি করছি আমি, কিন্তু আমার মতোই সমান সুযোগ পাচ্ছে ভারত, চীন, ভুটান। কিন্তু অন্য দেশ ইকোবান্ধব হওয়ায় ২ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছে। অথচ আমি ১০ শতাংশ সুদেও ঋণ পাচ্ছি না।”

উৎসঃ   বাংলা ট্রিবিউন
Comments
Loading...