আলজেরিয়ায় ফরাসী বাহিনীর গণহত্যা >২০ লাখের বেশি আলজেরীয় নিহত

0 ২১

ওলিউর রহমান ।।

ইউরোপের চোঁখ ধাঁধানো উন্নতি মানুষকে রোমাঞ্চিত করে। বাকী দুুনিয়ার মানুষ শান্তি-শৃঙ্খলা, উন্নতি-অগ্রগতির উদাহরণ দিতে গিয়ে ইউরোপের নাম করে। অথচ ইউরোপের এই উন্নতির পেছনের গল্প হলো বাকী দুনিয়াকে শোষণ করা। বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি আমেরিকাও এক সময় এই ইউরোপের করতলগত ছিলো। শিল্পবিপ্লবের পর বিশাল সংখ্যক পুঁজি সরবরাহের জন্য ইউরোপের দেশগুলো উপনিবেশ পদ্ধতি গ্রহণ করে। ব্রিটেন, স্পেন, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স এমনকি শান্তিবাদী সুইডেনের অবস্থাও এক্ষেত্রে ভিন্ন নয়।

বিখ্যাত ফরাসী ঐতিহাসিক ও রাজনীতিবিদ অ্যালেক্সিস দ্য তকিউভিলে ১৮৩৫ সালে প্রকাশিত তার ‘Democracy in America’ গ্রন্থে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা যদি আমাদের চিন্তাধারার প্রতি লক্ষ্য করি, আমাদেরকে প্রায় এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় যে, ইউরোপীয়রা মানবজাতির এক ভিন্ন গোত্রভুক্ত সম্প্রদায়, যেমন ইতর প্রাণীর বিপরীতে মানব সম্প্রদায়। সে তার নিজের প্রয়োজনে তাদেরকে বশীভূত করে এবং যখন তা করতে ব্যর্থ হয় তার বিনাশ সাধন করে।’

বর্তমান উত্তর উপনিবেশবাদ সময়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আমেরিকা এবং সাবেক সাম্রাজ্যবাদী গ্রেট ব্রিটেনের দিকে সময়ে সময়ে আঙ্গুল তোলা হলেও ইউরোপের অপর প্রভাবশালী ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের ব্যাপারটি অনুচ্চারিতই থাকে। অথচ ফ্রান্সই একমাত্র রাষ্ট্র যে তার উপনিবেশিত দেশগুলোতে এখনও শোষণের ধারা অব্যাহত রেখেছে।

ফ্রান্সের বর্তমান আয়তন ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৮৪৩ বর্গ কিলোমিটার। অথচ ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী এ দেশটির অধিভুক্ত এলাকা ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ছিল আফ্রিকা মহাদেশে।

দুই দফায় ফ্রান্সের প্রত্যক্ষ উপনিবেশ ছিল ১৭ শতক থেকে বিশ শতকের ষাটের দশকে আলজেরিয়া স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত। প্রথম দফায় ফরাসী উপনিবেশ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ, ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চল এবং উত্তর আমেরিকায়। এসময় ক্ষমতা বিস্তারের লড়াইয়ে ইংল্যান্ড, স্পেনের কাছে পরাজিত হয়ে ফ্রান্স তার সাম্রাজ্য গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয় দফায় ফ্রান্স শাসনের হাত বাড়ায় প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আফ্রিকার দিকে। আফ্রিকা বলতেই আমাদের সামনে অনুন্নত, অশিক্ষিত জাতিগোষ্ঠীর ছবি ভেসে উঠলেও ইউরোপীয় উপনিবেশের আগে আফ্রিকা ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এলাকা। ইউরোপের ক্ষমতালিপ্সু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো শোষণ করতে করতে যখন আফ্রিকাকে নি:শেষ করে ফেলেছে তখন তাদের সাম্রাজ্য গুটিয়ে নিয়েছে।

মানচিত্রের নীল এবং সবজ চিহ্নিত অংশটুকু ফ্রান্সের উপনিবেশিত এলাকা।

দ্বিতীয় দফায় ফ্রান্সের উপনিবেশিত অঞ্চল ছিল মালি, গিনি, কঙ্গো, গ্যাবন, সোমালিয়াসহ আফ্রিকার অন্য অনেক দেশ। তবে আফ্রিকার বৃহত্তর দেশ আলজেরিয়ায় ফরাসীদের উপনিবেশ ছিল দীর্ঘ দেড় শত বছর ধরে। আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৬২ সালে আলজেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করলে ফ্রান্স তার সর্বশেষ উপনিবেশিত ঘাঁটি ত্যাগ করে। ১৯৫৪ সাল থেকে ৬২ পর্যন্ত সময়ে ফরাসী বাহিনীর হাতে ২০ লাখের বেশি আলজেরীয় অধিবাসী নিহত হন। ফরাসীরা আলজেরিয়াতে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা চালায়।

ব্রিটিশ ঐতিহাসিক অ্যালিস্টার হর্ন তার বিখ্যাত অ্য সেভেজ ওয়্যার অব পিস বইতে লিখেছেন, অভিযান চলাকালে নৃশংসভাবে আলজেরীয় নারীদের ধর্ষণ করে ফরাসি সেনারা। ধর্ষণ শেষে অনেক নারীর স্তুন তারা কেটে ফেলে। হত্যার পর অনেকের মৃতদেহ বিকৃত করতেও কসুর করেনি  সেনারা।

আলজেরিয়া আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। ৭ম শতকের শেষভাগে আরব মুসলিমরা উত্তর আফ্রিকা জয় করে এবং ইসলাম ও আরবী ভাষার প্রচলন করে। বর্তমানে আলজেরিয়ার প্রায় সবাই মুসলিম ও আরবিভাষী।

আলজেরিয়াতে ভয়াবহ নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করে ২০১২ সালে প্রথম বক্তব্য দেন ফ্রান্সের তদানীং প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁন্সোয়া ওল্যাঁদ। ফ্রান্সোয়ার সাথে সুর মিলিয়ে দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমুনুয়েল ম্যাক্রোঁও স্বীকার করেছেন ফরাসী সেনারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আলজেরীয়দের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল।

আলজেরীয়দের ওপর নির্যাতনের কথা স্বীকার করলেও ফ্রান্স এ নিয়ে কখনো অনুতাপ প্রকাশ করেনি। সাম্রাজ্য গুটিয়ে নিয়ে আসলেও কৌশলে এখনও শোষণ, নিপীড়ন জারি রেখেছে দেশটি। বরং বলা চলে, ফ্রান্স টিকেই আছে তার সাবেক উপনিবেশ আফ্রিকাকে শোষণের মধ্য দিয়ে।

এটা গোপন কিছু না। সময়ে সময়ে ফরাসিরা নিজেরাও এটা স্বীকার করে। সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেঁরা ১৯৫৭ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আফ্রিকার উপর নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখতে না পারলে একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে ফ্রান্সের কোনো জায়গা থাকবে না।

পাঁচ দশক পর তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক ২০০৮ সালে সেটা আবারও নিশ্চিত করে বলেছিলেন, আফ্রিকা না থাকলে ফ্রান্স তৃতীয় বিশ্বের তালিকায় ছিটকে পড়ত। তিনি পরিষ্কারভাবেই স্বীকার করেছিলেন, ফ্রান্সের ব্যাঙ্কগুলোতে যে টাকা আছে, তার একটা বড় অংশ এসেছে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করার মধ্য দিয়ে।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, জেনোসাইড সিন্স নাইনটিন ফরটি ফাইভ : ফিলিপ স্পেন্সার

Comments
Loading...