উপনিবেশ আমলে ৪ বছরে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক বেদুঈন হত্যা করে ইটালি

0 ২৭

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ৭টি ইউরোপীয় দেশ (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি) আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন অংশ উপনিবেশ আকারে করায়ত্ত করার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। ১৮৭০-এর দশকে এটি শুরু হয়, ১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকে এটি চরমে পৌঁছে, এবং ২০শ শতকের শুরুর দশকে এর সমাপ্তি ঘটে। আফ্রিকার সাধারণ জনগণ এই উপনিবেশ স্থাপনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেও ইউরোপীয়দের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের কাছে পরাজিত হয়। এ সুযোগে ইউরোপের উপনিবেশবাদী দেশগুলো আফ্রিকার যাবতীয় প্রকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করার পাশপাশি দেশগুলোকে এমনভাবে পঙ্গু করে দেয়, যার ফলে আফ্রিকার দেশগুলো এখনো কোমর সোজা করে দাড়াতে পারেনি।

তখন লিবিয়ার ভূমিতে উপনিবেশ গাড়ে আজকের ইটালি।  ঐতিহাসিকদের মতে, লিবিয়ায় তখন ইটালিয়ানদের হাতে নির্মিত বন্দী শিবিরে প্রায় লক্ষাধিক বেদুঈনকে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হয়। তখন হাজার হাজার মানুষ করুণভাবে মৃত্যু বরণ করে।

ড. টোডেস্কি, যিনি ১৯৩১ সনে ইটালিয়ান সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিচালক ছিলেন, তার বইয়ে লিখেছেন, শুধু ১৯৩০সনে মে-সেপ্টেম্বরে মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় আশি হাজার লিবিয়ানকে বাধ্য করা হয়েছে যেন তারা তাদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করে বন্দী শিবিরে বসবাস করে।

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯২৮-১৯৩২ মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় ৫০ হাজার লিবিয়ানকে হত্যা করে ইতালিয়ান বাহিনী।

বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব জুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিজ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে কয়জন নেতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বীরদর্পে লড়াই করে গেছেন, তাদের মধ্যে লিবিয়ার সেনুসী আন্দোলনের নেতা ওমর আ‌ল-মুখতার অন্যতম। অকুতোভয় এই বীর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ঔপনেবিশিক শক্তি ইতালির বিরুদ্ধে লিবিয়ান মুজাহিদদের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ইতালি দখলদাররা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০ হাজার মানুষের সামনে তার সে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা হয়। তিনি শত্রুপক্ষের হাতে শাহাদত বরণ করেছেন, কিন্তু লিবিয়া তথা পুরো বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের কাছে অসম্ভব বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছেন।

১৯১২ সালে রোম লিবিয়াকে ইতালির উপনিবেশ বলে ঘোষণা দেয়। পরবর্তী ২০ বছর আল মুখতার ইতালির ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। ওমর আল মুখতারের গেরিলা হামলার মুখে ইতালি অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯১৩ সালে লিবিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দার্নাতে দুই দিনব্যাপী যুদ্ধে ৭০ জন ইতালীয় সেনা নিহত ও শতাধিক সেনা আহত হয়েছিল।

১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইতালিয়ান বাহিনীর সাথে লড়াইয়ের সময় এক ব্যক্তি তাকে সিদি ওমর বলে সম্বোধন করে ওঠলে শত্রুরা তাকে চিনে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তিন দিন পর ১৪ সেপ্টেম্বর গ্রাজিয়ানি বেনগাজিতে পৌঁছেন এবং ওমর মুখতারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০ হাজার মানুষের সামনে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়।

বিচার চলাকালে ইতালির কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, তিনি যদি তার মুজাহিদদের অস্ত্র পরিত্যাগের আহ্বান জানান, তাহলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। সে সময় মুখতার তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন, ‘আমার শাহাদাত আঙুল যেটি প্রতিদিন সাক্ষ্য দেয়- আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রাসূল, সেই হাত দিয়ে কোনো মিথ্যে কথা বা শব্দ লেখা সম্ভব নয়। আমরা আত্মসমর্পণ করব না। আমরা জয়ী হবো, নচেৎ আমরা শহীদ হবো।’

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বেনগাজি থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে এক ফাঁসির মঞ্চে হাতবাঁধা অবস্থায় তাকে আনা হয়। তিনি তখন নির্বিকার ও অবিচল চিত্তে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করছিলেন। ২০ হাজার মানুষকে সেখানে জোরপূর্বক উপস্থিত করা হয়।

ওমরকে ফাঁসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইতালিয়ানরা সেনুসি আন্দোলন এবং লিবিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম দমন করতে সক্ষম হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ওমরের নামই শ্রদ্ধা সহকারে স্বর্ণের অক্ষরে লিখে রেখেছে। গ্র্যাজিয়ানি সহ ইতালিয়ান জেনারেলদের নামই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্র্যাজিয়ানি সহ অনেকেরই যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার এবং শাস্তি হয়েছে। অন্যদিকে ওমর আল-মুখতার পরিণত হয়েছেন শুধু লিবিয়া না, পুরো আরব এবং মুসলিম বিশ্বের সংগ্রামের প্রতীকে।

সেনুসি আন্দোলনের এক মহান ইমাম মোহাম্মদ আল-মাহদি আস্‌-সেনুসি ওমর আল-মুখতার সম্পর্কে বলেছিলেন, “বিশ্বে নির্যাতিত মুসলমানদের বিজয়ের জন্য ওমর মুখতারের মতো শুধু দশ জন নেতাই যথেষ্ট।”

সূত্র : উইকিপিডিয়া

Comments
Loading...