এই ঘৃণার উপলক্ষ চঞ্চল নিজেই তৈরি করেছে

0 ১২২

চঞ্চল চৌধুরীর ফেইসবুকে মায়ের সাথে দেয়া ছবিতে চঞ্চলের ধর্ম পরিচয় নিয়ে তাকে হেনস্থা করা হয়েছে। চঞ্চলকে আমি কখনো দেখিনি, কিন্তু ওর বড় ভাই আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমরা একসাথে মেডিক্যাল কলেজে পড়েছি। কিছুদিন ওর বড় ভাই আমার রুমমেট ও ছিলো। তাই চঞ্চলকে আমি অনুজপ্রতিম স্নেহ করি, চঞ্চলের মা ও আমার মাতৃতুল্য। আমি তার এই হেনস্থায় খুবই মর্মাহত।

এবার আসেন, এটা কেন ঘটলো আমি সেই আলাপ করি। আমি রাখঢাক না করে আলাপটা করবো, সোজা সাপটা।

বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থা ভারতের মুসলমানদের সাথে তুলনীয় নয়। তিনটে কারণে। প্রথম কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের হিন্দুরা ক্ষমতার অংশ এবং ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ স্টেইক হোল্ডার। ভারতের মুসলমানেরা ক্ষমতার অংশ নয়। আমার তুলনার জন্য ক্ষমা চাইছি তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি, পাকিস্তান আমলে সংখ্যালঘু বিহারিরা কিছু ব্যতিক্রম বাদে সম্প্রদায় হিসেবে পাকিস্তানি শাসকের সাথে যেই সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলো, অনেকেটা সেই রকম সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাথে আবদ্ধ বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যতিক্রম ছাড়া আর সকলেই।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, হিন্দুত্বের সংজ্ঞা। সাভারকার “হিন্দু” দের সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এমনভাবে, যে শুধু তাকে হিন্দু ধর্ম পালন করলেই হবেনা, তাকে ভারতকে পুণ্য ভুমি ও পিতৃভূমি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। হিন্দুত্বের এই ধারণা নেপালের হিন্দুরা গ্রহণ না করলেও বাংলাদেশের হিন্দুরা গ্রহণ করেছে। ফলে ভারত রাষ্ট্র তার রিলিজিয়াস এজেন্সিই শুধু না তার পলিটিক্যাল এজেন্সি হয়ে বিরাজ করে। ভারতের মুসলমানদের ভারত রাষ্ট্রের বাইরে কোন পলিটিক্যাল এজেন্সি নাই।

তৃতীয় কারণ হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সমর্থনে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে একটা তীব্র দমনমুলক ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা কেন্দ্রীয় ভুমিকা আছে। যার তুলনীয় কোন পলিটিক্যাল ফর্ম ভারতের মুসলমানদের নেই।

এখন যেহেতু ভারত একটা হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র এবং ক্রমশই একটা রেইসিস্ট হিন্দুত্ববাদি রাষ্ট্রের দিকে তা ধাবিত হচ্ছে, খুব সহজেই বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট বিরোধী জনগোষ্ঠির কাছে ভারত-হিন্দু-আওয়ামী লীগ একটা অক্ষশক্তি হিসেবে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে।

ঠিক যেভাবে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই বাঙালি জাতীয়তাবাদের আকারে হাজির হয়েছিলো। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশে ফ্যাসিবিরোধী লড়াইয়ে “হিন্দু” প্রশ্ন বারেবারে আমরা না চাইলেও হাজির হবে এই কারণেই।

এইবার দেখেন চঞ্চল কী করেছিলো? সে ২০১৬ সালে খালেদা জিয়ার বাসভবনে গিয়ে একটা তালিকা টাঙ্গিয়ে দিয়েছিলো। সেই তালিকায় নাম ছিলো, যারা তথাকথিত আওয়ামী লীগ কথিত বিএনপির “আগুন সন্ত্রাসে” আহত হয়েছিলো। চঞ্চল কীভাবে জেনেছিলো যে এই আগুন সন্ত্রাসের জন্য খালেদা জিয়া দায়ী? মানুষের প্রাণের জন্য এতো মায়া চঞ্চলের তো হাজার হাজার ক্রস ফায়ারের ভিক্টিমের নাম কি হাসিনার বাসভবনে সে টাঙায়ে দিতে পারবে? আগুনের দায় তো সে সন্দেহের উর্ধে খালেদা জিয়াকে কখনো দিতে পারবেনা কিন্তু এই ক্রসফায়ার গুলোর দায় তো কোন সন্দেহ ছাড়াই শেখ হাসিনার।

এই কাজটা চঞ্চল করে নিজেকে একজন ফ্যাসিস্ট এনাবেলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এসব মানুষের কালেক্টিভ মেমোরিতে থেকে যায়। তাই তাকে ডলা দেয়ার যে কোন চান্স আম পাবলিকে ছাড়বে না। এইটা কোন হিন্দু বিদ্বেষ না। এটা ওই ভারত-হিন্দু-আওয়ামী অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পর্বত প্রমাণ ঘৃণা। এই ঘৃণার উপলক্ষ চঞ্চল নিজেই তৈরি করেছে। সেই তালিকা টাঙানোর জন্য অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত চঞ্চলকে দুঃখজনকভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হতে পারে।

আমার মায়ের সাথে আমার ছবি দিলে কেন এই একই ঘটনা ঘটবে না? তফাৎ কেন হবে? উত্তর এইখানে খুজুন।

Comments
Loading...