এক সময় আমার বাবা রিস্কা চালাতেন তাই আমি তাদের দুঃখ বুঝি

0 ৬৬

আমরা যখন অনেক ছোট, তখন আমার আব্বা রিকসা চালাতো। একদিন হরতাল চলছিলো। কিন্তু আব্বা আমাদের পেটের জ্বালা মেটাতে রিকসা নিয়ে বের হয়। কিন্তু এক নেতা হরতালে রিকশা দেখে আব্বাকে অনেক গালিগালাজ করেন। রিকসা ভেঙে ফেলবে, আব্বাকে ধাক্কায়ে রিকসা থেকে ফেলে দেয় এমন অবস্থা।

আব্বার কি দোষ? সব দোষ তো আমাদের। খাবার না পেলে আমরা সারাক্ষণ কাঁদতে থাকতাম। কিন্তু আব্বার এই অপমান সহ্য হলো না। তিনি রিকসা চালানো ছেড়ে দিয়ে রাজমিস্ত্রীর হেলপার হিসেবে কাজ শেখা শুরু করলেন। এরপর আস্তে আস্তে মিস্ত্রি হলেন। সমাজের অনেক লোক তার বাবার পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করলেও, বাবা মায়ের পেশা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগলেও, আমি ভুগিনা। কারণ আমার যে পরিবারে জন্ম হয়েছে, এতে তো আমার হাত নেই। বরং এমন পরিবারে জন্ম হওয়ার পরেও আমার আব্বা আমাকে রিকসা হাতে তুলে না দিয়ে, গেরেজ কিংবা মিস্ত্রির কাজে না দিয়ে, স্কুলে পাঠিয়েছে। এজন্য প্রতিটা সন্তানের উচিত তার পিতামাতার প্রফেশনকে সম্মান করা, ঐ পেশার অন্যান্যদের বাবার মত সম্মান করা।

আব্বার মুখ থেকে তাকে অপমানের কথা শুনেছি। আমরা যখন অনেক ছোট, তখন বেশি বেশি হরতালের হতো। রাজনৈতিক দলের জন্য হরতাল পছন্দনীয় হলেও, গরীব মানুষ কখনো চায় না গাড়িঘোড়া, দোকানপাট বন্ধ থাকুক। যারা রিকসা, ভ্যান, বাস, ট্রাক চালায় তারা হরতাল বোঝেনা, রাজনীতি বোঝেনা। তারা বোঝে পেটের ক্ষুধা।

ঠিক একইভাবে গরীব মানুষ করোনা বোঝেনা, লকডাউন বোঝেনা, বোঝে পেটের ক্ষুধা।
অনেকে বলবে, দেশে এমন গরীব মানুষ নাই, যে কিনা ১ সপ্তাহ কাজ না করে চলতে পারবেনা। একজন গরীবের সন্তান হয়ে, তাদের প্রতিনিধি হয়ে বলছি, গরীব মানুষ সঞ্চয় বোঝেনা, সেই শিক্ষা তাদের নেই, আবার সঞ্চয়ের জন্য যে পরিমাণ উপার্জন দরকার, সেটিও তাদের হয় না। আবার এসব রিকসা,ভ্যানচালক, দিনমজুর সকলের ঘাড়ে কিস্তির বোঝা। বিশ্বাস করেন, কিস্তি দিতে না পারলে এনজিও কর্মীরা বাড়িতে এসে বসে থাকে, থানাহাজতের ভয় দেখায়, টিনের চাল খুলে নেওয়ার কথা কয়।

সবথেকে বড় কথা, গরীবের সংসারে আয় কম, কিন্তু খাওয়ার মুখ বেশি। তাদের মধ্যে সচেতনার অভাব। তারা মনে করে, মুখ দিয়েছেন যিনি, খাবার দিবেন তিনি। কিন্তু চিত্র ভিন্ন। গরীবদের প্রতিটা দিন কাজ করতে হয়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে খেতে হয়। অন্যথায় চুলায় আগুন জ্বলেনা, সেই আগুন পেটে এসে জ্বলে। আর পেটের আগুন মানেনা কোন করোনা, মানেনা লকডাউন, মানেনা সরকারের নিষেধাজ্ঞা!

তাই সরকারের নিকট আহ্বান করবো, গরীব মানুষদের খাবার নিশ্চিত করুন। করোনা মহামারী কমানোর জন্য লকডাউন যদি হয় করোনা কমানোর ওষুধ, তবে গরীবরা যাতে আয়ের জন্য বাইরে বের না হয় এজন্য তাদের পেটের ওষুধ দিন। এতেই কার্যকরভাবে পালিত হবে লকডাউন। দেশে তো ধনীর অভাব নাই, টাকারও অভাব নেই, খাদ্যের অভাব নেই। সরকার সঠিক পরিকল্পনা নিলে খাদ্য ও সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে গরীবের পেটের ক্ষুধা নিবারন সম্ভব। আর পেটের ক্ষুধা মেটানোর বন্দোবস্ত হলে সকলে নিরাপদ থাকবে বলে বিশ্বাস করি।

(এই রিকসাওয়ালার আহাজারি যেন আমার বাবার আহাজারিই মনে হলো। আমি তার মধ্যে খুঁজে পেলাম আমার বাবার রক্ত, ঘামে ভেজা শরীরটা। সেই বেদনা থেকেই লেখাটি লেখা।)

Comments
Loading...