জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েসকে হত্যার আগে ‘ হট্টগোলের শব্দ পেয়েছিলেন’ স্ত্রী

“শেখ হাসিনার গুম-খুনের রাজনীতি”-৪৭

0 ১১৮

‘গণমাধ্যমের শিকারী’ হিসেবে বিশ্বের কুখ্যাত লোকদের তালিকায় প্রথমবারের মতো ঠাঁই পাওয়া শেখ হাসিনার শাসনামলে শত শত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে বিনাবিচারে তথাকথিত ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে। ছাত্র, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে চিকিৎসক – নির্মম হত্যাযজ্ঞ থেকে বাদ যায়নি কেউই।

“শেখ হাসিনার গুম-খুনের রাজনীতি” শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ তুলে ধরা হয়েছে নড়াইল জেলার একজন জনপ্রতিনিধির নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা।

রাজধানীর নারিন্দা এলাকার একটি মেস থেকে (১৬ জানুয়ারি, ২০১৫) তুলে নিয়ে নড়াইলের পৌর কাউন্সিলর জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েসকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারির সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা তো অনেকেই ভুলে গেছেন! কিন্তু, শেখ হাসিনার নির্মমতার ক্ষত এখনো বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন ইমরুল কায়েসের প্রিয়জনেরা। নড়াইলের অধিবাসীরাও জনপ্রিয় সেই তরুণ নেতার এমন হত্যাকাণ্ড আজও মেনে নিতে পারেন নি।

১৯টি গুলির ক্ষতচিহ্ন:

নিরস্ত্র জনপ্রতিনিধিকে প্রথমে চোখ বেঁধে মধ্যরাতে নেয়া হয় জনশূণ্য মাঠটিতে। তারপর চোখ খুলে তাকে দৌঁড়াতে বলা হয়। এরপর হায়নার মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খুনীরা। এমন ঘটনা বিশ্ববাসী জেনেছিলো বাংলাদেশের টেকনাফে পৌর কাউন্সিলর ও স্থানীয় যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. একরামুল হকের খুনের ঘটনায়।

ঠিক একই কায়দায় হত্যা করা হয় জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েসককে। তাঁকে হত্যার ঠিক আগ মুহূর্তে টেলিফোনে হট্টগোল শুনেছিলেন তার স্ত্রী। কিন্তু, পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপে তিনি তার মুখ বন্ধ করতে বাধ্য হন।

হত্যাকাণ্ডের পর ইমরুল কায়েসের মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিলেন এসআই ফিরোজ আলম। তিনি জানান, ইমরুল কায়েসের শরীরে গুলির ১৯টি ছিদ্র ছিল।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহানের তত্ত্বাবধানে এ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছিলো। নিহতের শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন তিনি।

সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির বুকের বাঁ পাশে ছয়টি, বাঁ হাতের কনুইয়ের নিচে একটি গুলির ক্ষত ও কনুইয়ের ভেতর দিয়ে গুলি বের হয়ে যাওয়ার আরেকটি ক্ষত রয়েছে। ডান পাশের বগলের কাছে একটি, ডান বাহুর ওপরে আরেকটি, ঘাড়ের ডান পাশে কানের নিচ দিয়ে আরেকটি এবং পিঠের ওপর বাঁ দিকে তিনটি ও ডান দিকে তিনটি এবং পেছনে কোমরের ওপর আরও দুটি—মোট ১৯টি গুলির চিহ্ন রয়েছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান নিপুর উপস্থিতিতে লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছিল।

রাজনৈতিক পরিচয়:

মাত্র ৩৮ বছর বয়সী ইমরুল কায়েস ছিলেন নড়াইল পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও স্থানীয় জামায়াত নেতা। অসম্ভব জনপ্রিয় এই নেতা নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াকালীন ইসলামী ছাত্র শিবিরে যোগ দেন। ছাত্রত্ব শেষ হবার পর জামায়াতের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন তিনি।

নড়াইল পৌরসভার ডুমুরতলা ঈদগাহপাড়ার মো. আনোয়ার হোসেন মোল্যার ছেলে তিনি।

নিহত ইমরুলের খালাতো বোনের স্বামী জাহিদুর রহমান জানান, এক কন্যা সন্তানের জনক ইমরুল রাজধানীর দক্ষিণ মৈসুন্দি এলাকার একটি মেসে থাকতেন। তিনি ২০১৫ সালে এলএলবি পরীক্ষা দিয়েছিলেন।

রাজনৈতিক মামলা:

ইমরুল কায়েসকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার পর তাকে কুখ্যাত আসামি হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে পুলিশ।

নড়াইল সদর থানার সেই সময়কার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মতিয়ার রহমান তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সন্দেহভাজন হিসেবে থানায় দায়ের হওয়া অনেকগুলো মামলার আসামি ছিলেন ইমরুল কায়েস। পুলিশের ওপর হামলার একটি মামলাও ছিলো তার বিরুদ্ধে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রহসনের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিরুদ্ধে সারাদেশের মানুষ প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিলো। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর নড়াইল পৌরসভার ডুমুরতলার তিন রাস্তার মোড়েও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করে বিএনপি-জামায়াত। কিন্তু, সেই কর্মসূচিতে হামলা চালায় পুলিশ ও সরকারদলীয় গুণ্ডারা। হামলায় বিরোধী দলের শত শত কর্মী আহত হন। সদর থানার ওসি (তদন্ত) মুক্তার হোসেনও এই সংঘর্ষে জখম হন।

এই ঘটনায় ৭৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও আড়াই থেকে তিন হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ মামলা করেছিলো আওয়ামী লীগের মদদপুষ্ট পুলিশ। সেই মামলার ৪৪ নম্বর আসামি ছিলেন নড়াইল পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও স্থানীয় জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েস।

জনপ্রিয় এই জামায়াত নেতার হন্তারক ডিবি ঠাণ্ডা মাথার সংঘটিত এই খুনকে জায়েজ করতে দাবি করে, নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নড়াইল সদর থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে।

খুনের পর ডিবির মিথ্যাচার:

ইমরুল কায়েসকে হত্যার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ বিভাগ থেকে সেই পুরোনো গৎবাঁধা ক্রসফায়ারের গল্প শোনানো হয়।

বলা হয়, সোমবার ভোর রাত ৩টার দিকে মতিঝিল এজিবি কলোনি কাঁচাবাজার এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ইমরুল।

শেখ হাসিনার হয়ে খুন-গুমে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকা ডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ডিবির পূর্ব বিভাগের মতিঝিল জোনাল টিম ও খিলগাঁও জোনাল টিম মতিঝিল এজিবি কলোনি ও আইডিয়াল কলেজের মধ্যবর্তী জায়গায় ছয়-সাতজন সন্দেহভাজনকে দেখে। সন্দেহভাজনেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে একটি ককটেল নিক্ষেপ করে ও গুলি করা শুরু করে। ডিবির সদস্যরাও ১৭টি পিস্তলের ও ২৩টি শটগানের গুলি ছোড়েন।

অর্থাৎ ক্রসফায়ারের সাজানো ফরমেটের মিথ্যাচারই গণমাধ্যমকে জানানো হয়।

ডিবির দাবি, সন্ত্রাসীদের নিজেদের গুলিতেই আহত হয়ে মারা যান ইমরুল কায়েস। ঘটনাস্থল থেকে গুলিভর্তি পিস্তল ও পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করা হয়।

ইমরুল কায়েসকে হত্যার আগে ‘ হট্টগোলের শব্দ পেয়েছিলেন’ স্ত্রী :

টেকনাফের জনপ্রতিনিধি একরামের মতোই, অন্ধকারে খোলা মাঠে হত্যার আগে ইমরুল কায়েসের স্ত্রী একটি ‘মিসড কল’ পেয়েছিলেন তার স্বামীর ফোন থেকে। কল ব্যাক করলে অপর প্রান্ত থেকে গা-হিম করা কথা বলা হয় তাঁকে।

‘আপনার স্বামীর সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা ও কথা হবে না,’ ইমরুল কায়েসের ফোন থেকে অপরিচিত লোকটি হত্যার আগেভাগে এমনই কথা বলেন জামায়াতের এই নেতার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসকে।

তিনি বলেন, ‘এর কিছু সময় পরে তাকে আবাও ফোন দিলে একজন অপরিচিত লোক ফোন ধরেন। সে সময় হট্টগোলের শব্দ পাই। এরপর সোমবার দুপুরে (১৯শে জানুয়ারি, ২০১৫) তার স্বামীর ফোন থেকে অপরিচিত একজন ফোন করে তার মৃত্যুর খবর জানায় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে যেতে বলে।

জান্নাতুল ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, হত্যাকাণ্ডের চার-পাঁচ দিন আগে থেকে তাঁর (স্বামীর) সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর নড়াইলে পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় কায়েসকে আসামি করার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।

তিনি বলেন, তার স্বামী ইমরুল কায়েসকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে।

Comments
Loading...