দুদক-মাদক সমঝোতা!

0 ১৬

দেশের ১৮ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীসহ ৩৬৫ মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে চার বছরেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের অর্জিত অবৈধ সম্পদ, বেনামী সম্পদের পাহাড় রয়েছে অক্ষত। কারো কারো সম্পদের পাহাড় হয়েছে আরো উঁচু। কেউবা নব উদ্যোমে ভিন্ন কৌশলে সদর্পে চালিয়ে যাচ্ছেন মাদক ব্যবসা।

বিদেশে তৈরি করেছেন ‘সেকেন্ড হোম’। ফলে সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে চার বছর আগে সংস্থাটি যে বাগাড়ম্বর করেছিল তা শুধু মাদক ব্যবসায়ীদের সুড়সুড়িই দিয়েছে। কার্যত: তাদের কিছুই হয়নি। ফলে-দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের মাঝে অদৃশ্য কোনো সমঝোতা হয়েছে কি-না ঘণিভূত হয়েছে এ সন্দেহ।

দুদক সূত্র জানায়, দেশের ১৮ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। সেও ২০১৭ সালের কথা। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (নারকোটিকস) থেকে প্রাপ্ত তালিকা ধরে দুদক তাদের সম্পদ অনুসন্ধানের ঘোষণা দিয়েছিল। সেবছর ৭ মে ‘মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন : আমাদের করণীয়’ শীর্ষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুদকের তৎকালিন চেয়ারম্যান জানান, শুধু ১৮ জন মাদক ব্যবসায়ীই নন-মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রস্তুতকৃত ৩৬৫ মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা ধরে ‘অ্যাকশন’এ যাবে দুদক। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আর কোনো কথা নয়, এখন হবে অ্যাকশন।’ তবে সেই ‘অ্যাকশন’ তার শেষ চার বছরের কার্যকালে তো হয়ই নি-এমনকি তিনি বিদায় নেয়ার পরবর্তী চার মাসেও দেখা যায়নি কোনো অ্যাকশন। ফলে দুদক নামক প্রতিষ্ঠানটির কারো বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশনে’ যাওয়ার হুঙ্কার কার্যত: অসাড় বাগাড়ম্বর বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, আগাম হুঙ্কার দিয়ে কখনো কারো বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়া যায় না। বরং যাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হবে-তাদেরকে সতর্কই করা হয়।

সূত্রমতে, দেশ মাদকমুক্ত না হলে ১১টি দেশের উন্নয়ন জোনে থাকার সুযোগ পাবে না বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে মাদকের বিস্তার এতোটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল যে, অন্তত ৮ হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করেছে দেশটি। মাদক ব্যবসায়ীদের হত্যা নয়Ñ নিধেনপক্ষে তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়া হবেÑ এমন একটি উদ্দেশ্য থেকেই দুদক মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাবে বলে ধারণা করেছিল সাধারণ মানুষ। সেটি তো হয়-ই নি বরং তাদের অর্থ-সম্পদে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে দ্বিগুণ উদ্যোমে মাদক ব্যবসা করার প্রেক্ষাপটই যেন তৈরি করে দেয় দুদক। গত চার বছরে কোনো মাদক ব্যবসায়ী কিংবা এদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংস্থাটি। বরং মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কোনো কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে বিশেষ ধরনের ছাড় দিয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্রটি জানায়, ২০১৭ সালে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা পাঠায় দুদকে। তালিকায় ঠাঁই পাওয়া মাদক ব্যবসায়ীরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রভাবশালী। রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে কারো কারো। ওই তালিকায় সরকারদলীয় একজন এমপির ভাই এবং ঘনিষ্ঠজনদের নামও ছিল। দালিলিক কোনো প্রমাণ না থাকায় তাদেরকে প্রচলিত মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে স্পর্শ করা যায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশকিছু খুচরা মাদক ব্যবসায়ীকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করে। কিন্তু তাদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে-তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে কোনো আঘাতই হানেনি দুদক।

সূত্রমতে, নামকরা ৩৬৫ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে ১৮ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। এর মধ্যে ছিলেন, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের ইসতিয়াক হোসেন, মিরপুর রূপনগর চলন্তিকা বস্তি (ঝিলপাড়) ও নজরুল ইসলাম নজু, রামপুরা পলাশবাগের মো. তানিম, বাড্ডা সাতারকুল বড় মসজিদ এলাকার মো. জয়নাল, খিলগাঁওয়ের মো. সাদু, রূপগঞ্জ চনপাড়ার মো. বজলুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ মাসদাইরের শাহীন ওরফে বন্ধন শাহীন, লক্ষ্মীপুর বাঞ্জানগরের শাহ আলম মিন্টু, লক্ষ্মীপুর কমল নগরের আলী হোসেন, খুলনা খানপাড়া মহিরবাড়ির খোকন শেখ, কক্সবাজার টেকনাফের সাহেদুর রহমান, একই এলাকার চৌধুরী বাড়ির মো. সাদিক, টেকনাফের দক্ষিণ ফুলের ডেইল’র মো. রাশেদ, গুদারবিলের জিয়াউর রহমান, ডেইলপাড়ার মো. আমিন, চৌধুরী পাড়ার মমিং সেন, শিলবনিয়াপাড়ার হাজী সাইফুল করিম এবং একই এলাকার চান্দুলিপাড়ার মো. ইউনুস সিকদার।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব ব্যক্তির কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে দুদক। পরে রহস্যজনক কারণে অনুসন্ধান হিমাগারে চলে যায়। দুদক থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয় যে, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য-উপাত্ত দিচ্ছে না। যা দিয়েছে তা অধিকাংশই ভুল। এর পর মাদক সংক্রান্ত অনুসন্ধানের আর কোনো আপডেট জানায়নি দুদক।

এদিকে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা দেন। এ সময় কক্সবাজার ভিত্তিক খুচরা ইয়াবা কারবারী র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়। র‌্যাবের অনুকরণে তখন দুদকও কক্সবাজার ভিত্তিক ৭৪ মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করে তাদের সম্পদ অনুসন্ধানের ঘোষণা দেয়। সংস্থার তৎকালিন পরিচালক কাজী শফিকুল আলম এবং সৈয়দ ইকবালের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান টিমও গঠন করা হয়। উক্ত টিম কিছু ব্যক্তির তথ্য-উপাত্ত চেয়ে বিভিন্ন দফতরে চিঠি দেয়। এরপর এ উদ্যোগেরও কোনো ফলো-আপ জানা যায়নি।

তবে দুদকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মাদক ব্যবসায়ী এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের সঙ্গে বিশেষ সমঝোতা হয়ে যাওয়ায় অনুসন্ধানটি আর এগোয়নি। মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ অর্থ-সম্পদ অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদকের অনিহার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় এতেই।

সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট মুহাম্মদ রেজাউল করিম ইনকিলাবকে বলেন, এটি দুদকের সদিচ্ছার বিষয়। দুদকের আইনটি এমনভাবেই প্রণয়ন করা হয়েছে যে, যেকোনো নাগরিকের সম্পদ অনুসন্ধানের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে। কিন্তু সেটি তারা করবে কি না এটিই হচ্ছে প্রশ্ন। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৬(১), ২৬(২) এবং ২৭ (১) ধারায় মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারে দুদক। কিন্তু কি কারণে কোনো অনুসন্ধানই যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগোয় নাÑ এ বিষয়টি নিয়ে বরং তদন্তের দাবি রাখে। মাদক ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী। তাদের হাত অনেক লম্বা। সেই হাত দুদক অবধি পৌঁছেছে কি না-এখন এ প্রশ্নই সামনে চলে আসে। আমার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত রহস্যজনকই মনে হয়Ñ মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।

উৎসঃ   ইনকিলাব
Comments
Loading...