সুনামগঞ্জে সংখ্যালঘু গ্রামে হামলা: নেপথ্যে কি?

0 ৮৩

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও হিন্দুদের বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। মাওলানা মামুনুল হককে কটূক্তিকারী যুবক নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাশ আপনকে গ্রেপ্তারের পরও সংখ্যালঘুদের বাড়িতে সংঘবদ্ধ হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রকাশ্যে মাইকিং করে হামলার ঘটনার পেছনে আর কোনো ঘটনা লুকায়িত আছে কি না এমন প্রশ্ন করেছেন অনেকেই। নাম না প্রকাশের শর্তে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ভুক্তভোগীরা জানায়, নোয়াগাঁও হিন্দুদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরে যোগ দিয়েছিলেন নাচনী, চণ্ডিপুর, সন্তুষপুর, ধনপুর, খাশিপুরসহ দিরাই শাল্লা উপজেলার কয়েক  গ্রামের হাজার লোকজন।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, হামলার মূল নেতৃত্বে ছিলেন দিরাই উপজেলার নাচনী গ্রামের বর্তমান ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলাম স্বাধীন ও একই গ্রামের ক্ষমতাধর আরেক ব্যক্তি পক্কন মিয়া। নাচনী গ্রামের স্বাধীন মেম্বার স্থানীয় বরাম হাওরের কুচাখাই বিলের ইজারাদার। জলমহাল নিয়ে স্বাধীনের সঙ্গে কিছুদিন ধরে গ্রেপ্তারকৃত যুবক ঝুমন দাশসহ নোয়াগাঁও গ্রামে কিছু লোকের  বিরোধ চলে আসছিল।

জলমহালে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ ও জলমহালের পানি শুকানোর ফলে চাষাবাদে সেচের পানির সংকটের ব্যাপারে নোয়াগাঁও গ্রামের হরিপদ দাস ও মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ দন্দ্র দাস শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে স্বাধীন মেম্বারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৮ই জানুয়ারি সরজমিন কুচাখাই বিলে গিয়ে অবৈধ মেশিনসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করে জলমহালের পানি ছেড়ে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মোক্তাদির হোসেন। এ সময় বাঁধ কাটার কাজে অংশ নেন নোয়াগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অকিল চন্দ্র দাসের ছেলে অমর চন্দ্র দাস। পানি ছেড়ে দেয়ার দৃশ্য ফেইসবুকে প্রচার করেন একই গ্রামের ঝুমন দাশ। এই ঘটনায় স্বাধীন মেম্বার নোয়াগাঁও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হুমকি-ধামকি দিয়ে আছিলেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। ঝুমন দাসের এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় হুজুগ তুলে নিজের লোকদের দিয়ে বুধবার নোয়াগাঁও  গ্রামে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ করেন গ্রামের অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।

নোয়াগাঁও  গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত  সৈলেন চন্দ্র দাস বলেন, স্বাধীন ও পক্কনের নেতৃত্বে আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। তারা আমার ঘরের টাকা পয়সা অলঙ্কার নিয়ে গেছে। স্বাধীনের সঙ্গে আমাদের গ্রামবাসীর বিরোধ ছিল। সে বরাম হাওরের কুচাখাই বিল শুকাতে চেয়েছিল আমরা গ্রামবাসী বাধা দেই। বিল সেচার কারণে জমিতে পানি দেয়া যায় না। পানির অভাবে জমি-ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। এই বিষয়ে আমরা ইউএনও সাহেবের কাছে অভিযোগ করি। অভিযোগকারী ছিলেন আমার কাকা হরিপদ দাশ। এই কারণেই হরিপদ বাবুর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িঘরের বেশি ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা অকিল চন্দ্র দাশ বলেন, আমি ঘরে ছিলাম। আমার ঘরের দরজা ভাইঙা সব কিছু ভেঙে টাকা পয়সা মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটসহ অনেক কিছু নিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা বলার পরও তারা আমারে রেহাই দেয়নি। শত শত মানুষ। আমি শুধু পক্কন মিয়া ও স্বাধীন মেম্বারকে চিনেছি। তিনি স্বাধীন মিয়ার সঙ্গে আমাদের বিরোধ আছিল। ওসি ও ইউএনও সাব যখন বাঁধ ভাঙার অনুমতি দিছেন তখন আমার ছেলে অমর চন্দ্র দাশ বাঁধ কাটে। এই কারণেই সে আমার ঘরে বেশি ভাঙচুর করে। এমন ঘটনার নেতৃত্ব দেয়ায় স্বাধীন মেম্বারের বিচারের দাবি করেন তিনি।
অপরদিকে সনাতন ধর্মালম্বীদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ও মূল ইন্ধনদাতাদেরকে ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

দুই মামলা, আটক ২৪: সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত নোয়াগাঁও গ্রামে বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। উস্কানিদাতা হিসাবে নাচনী গ্রামের বাসিন্দা সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) স্বাধীন মিয়াকে প্রধান আসামি করে মামলায় প্রায় দেড় হাজার জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সকলেই সরমঙ্গল ইউনিয়নের চন্দ্রপুর ও নাচনী এবং শাল্লা থানার হবিবপুর কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা। একটি মামলার বাদী শাল্লা থানার এসআই আব্দুল করিম। অন্য মামলার বাদী স্থানীয় হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল। এর প্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বিকালে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে শাল্লা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক জানান, ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আটকে অভিযান চলছে। অভিযান পরিচালনার স্বার্থে আটকদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি।

এদিকে, সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ৩২ বান্ডিল টিন এবং ৭ টন চাল তুলে দেয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান ও পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমদ এই সহায়তা সামগ্রী তুলে দেন। এ সময় জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

ডিআইজি মফিজ উদ্দিন বলেন, হামলার ঘটনায় দেড় হাজারেরও বেশি আসামি করে দু’টি মামলা দায়ের হয়েছে। ইতিমধ্যে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় এনে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা হবে।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে যারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, ভাবতে হবে কারা এমন শত্রু। তাদের যে পরিচয়ই থাকুক না কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

জড়িতদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত করার আহ্বান
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত করে, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ। পাশাপাশি ওই গ্রামে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিও জানান তারা। গতকাল বিকালে ‘শাহবাগে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ ও ‘বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ’এর ব্যানারে মানববন্ধনে বক্তরা এসব দাবি জানান। বক্তরা বলেন, সুনামগঞ্জের নোয়াগাঁও গ্রামে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে। সরকার এই হামলা নিবৃত করতে ব্যর্থ হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর যারা হামলা করেছে, তাদের সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। এই ঘটনা কারা, কি উদ্দেশ্যে ঘটিয়েছেন তা খুঁজে বের করতে হবে। সরকারের সঙ্গে হেফাজতের আঁতাতের কারণেই একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা হলেও, এর একটিরও বিচার হচ্ছে না। তারা বলেন, আমরা দেশের শান্তি চাই। স্বাধীনতার ৫০ বছর এসেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগেই আছে। যা এই দেশের শান্তিকামী মানুষ চায় না। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে হাসিল করতে সাম্প্রদায়িক ঘটনায় রূপ দিয়েছেন। আমরা আশা করবো সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা খুঁজে বের করবেন। আমরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চাই না, দেশে শান্তি চাই। অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাই। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, সংস্কৃতির সভাপতির ড. মকবুল হোসেন, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান) এর সভাপতি ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা, চারু শিল্পী সংসদের সাধারণ সম্পাদক কামাল পাশা চৌধুরী, আওয়ামী যুবলীগের প্রচার সম্পাদক জয়দেব নন্দী, সুব্রত দাস খোকন, এফএম শাহীন, অনিকেত রাজেশ প্রমুখ।
শাল্লায় হামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত: হেফাজত
সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা রাজননৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। শুক্রবার সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী স্বাক্ষরিত এক বিবৃবিতে এ নিন্দা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা জানতে চাই, কারা এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে এবং কারা হাজার হাজার হামলাকারীকে সংগঠিত করেছে? অথচ এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করাও হয়নি বলে গণমাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। হাজার হাজার মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা করলো, অথচ আশ্চর্যজনকভাবে সেখান থেকে কাউকেই গ্রেপ্তার করা হলো না কেন? সেখানকার আক্রান্ত হিন্দু সমপ্রদায় বলেছে তারা আগেই মাইকে হামলার খবর শুনে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে গেছেন। এই হামলার খবর তাদেরকে আগে কারা জানালো? আগে-ভাগে হামলার আশঙ্কা জেনেও স্থানীয় প্রশাসন কেন যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি? এই অবহেলা বা ব্যর্থতার দায় অবশ্যই সেখানকার প্রশাসনকেই নিতে হবে। এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা। আর হিন্দু গ্রাম শাল্লায় জলমহালের দখল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে দাঙ্গা ও হানাহানির ঘটনা নিয়মিত এবং পুরনো। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত তদন্ত, অনুসন্ধান ও প্রমাণ ছাড়াই হেফাজতে ইসলামকে জড়িয়ে উদ্দেশ্যমূলক প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে কয়েকটি চিহ্নিত ভারতপন্থি মিডিয়া। আমরা তাদের এহেন অপেশাদার ও হলুদ সাংবাদিকতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। অতীতে হিন্দু সমপ্রদায়ের উপাসনালয়ে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে হেফাজতে ইসলাম সেটার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমরা সবাইকে স্পষ্ট জানাতে চাই যে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয় ও বাড়িঘরে কোনো ধরনের হামলাকে হেফাজত সমর্থন করে না। বিবৃতিতে বলা হয়, সুনামগঞ্জের শাল্লায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার আমরা নিন্দা জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত নিরীহ হিন্দু পরিবারদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করছি এবং সরকারের কাছে এহেন নিন্দনীয় হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।

mzamin

Comments
Loading...