ডেঞ্জার জোন সিলেট

পাঁচ দফা ভূমিকম্প

0 ৩১

ভূমিকম্পে কাঁপছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনপদ সিলেট। বার বারই কেঁপে উঠছে। শনিবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৫ বার কাঁপলো। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিলেটে। পাশেই ডাউকী ফল্ট। ভূমিকম্পের ডেঞ্জার জোন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ডাউকী ফল্টে ওলটপালট হলে ভয়াবহ কিছু হতে পারে সিলেটে। স্থানীয়ভাবে উৎপত্তি হয়ে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সিলেট নগরে নেমে আসতে পারে দুর্যোগ।

এই আশঙ্কা নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রশাসনও। গতকাল বিকাল এ নিয়ে সিলেটের প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও দুর্যোগ প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় নিয়োজিত দপ্তরগুলোর কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠক করেছেন। শনিবার সকাল ১০টা ৩৭ মিনিট। হঠাৎ করেই ঝাঁকুনি সিলেটে। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্রই। এরপর সকাল ১০টা ৫১ মিনিট, বেলা ১১টা, বেলা ১১টা ৩ মিনিট, বেলা সাড়ে ১১টা ও সর্বশেষ বেলা দুইটায় আবারো ভূমিকম্প অনুভূত হয়। পরপর পঞ্চম দফা ভূমিকম্পে সিলেটে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহুতল ভবন ছেড়ে লোকজন ছুটে আসেন রাস্তায়। দফায় দফায় ভূমিকম্প নিয়ে বাসাবাড়িতে থাকা লোকজনের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দেয়। ক্ষয়ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও আতঙ্কিত মানুষজন সতর্ক রয়েছেন। সিলেট ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সিলেটে ৪ বার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার বিষয়টি সিসমিক মিটারে ধরা পড়েছে। এর মধ্যে সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে হওয়া প্রথম ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ১। অন্য কম্পনগুলোর মাত্রা ছিল তার চেয়ে কম। এবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিলেট সদর ও আশপাশ এলাকা। এ কারণে সিলেটেই কেবল ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। তিনি জানান, পরপর ভূমিকম্প হওয়া আতঙ্কের বিষয়। এজন্য নগরবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের সময় হুড়োহুড়ি না করতে তিনি নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। এদিকে- এর আগেও গত দুই বছর সিলেটে কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়। সিলেটে কাছাকাছি ডাউকী ফল্টেও ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট ভূমিকম্পের ডেঞ্জার জোনের মধ্যে পড়েছে। সিলেট একদিকে ভূকম্পের উৎপত্তিস্থল ‘ডাউকী পয়েন্ট’-এর মাত্র ২শ’ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অন্যদিকে শাহবাজপুর ফল্টও (ভূগর্ভস্থ প্লেটের ফাঁক, এটি হবিগঞ্জ-কুমিল্লা এলাকাধীন) সিলেটের কাছাকাছি। যে কারণে সিলেটের জন্য ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুব বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকিভেদে তিনটি বলয় নির্ধারিত রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তথা প্রথম বলয়েই সিলেটের স্থান। এ বলয়ে ৭-৯ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। ২০০৯ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী- সিলেট অঞ্চলে ৫২ হাজার ভবন রয়েছে। তন্মধ্যে ২৪ হাজার ভবনই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। জরিপের তথ্য  দেখে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বিল্ডিং কোড অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এদিকে সিডিএমপির জরিপে সিলেটে ভূকম্পের ঝুঁকিতে ২৪ হাজার ভবনের কথা উল্লেখ করা হলেও সিলেট সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত বিভাগের কাছে এ সম্পর্কিত সঠিক তথ্য নেই। ২০০৬ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশবিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, সিলেট মহানগরীতে শতাধিক প্রাচীন ভবন রয়েছে- যেগুলোর বয়স একশ’ থেকে দেড়শ’ বছর। এসব ভবন ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁঁকিতে রয়েছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে রয়েছে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার কার্যালয়, কাস্টমস অফিস, জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, সিটি মার্কেট, সিলেট সাব পোস্ট অফিসের ফরেন রেমিটেন্স ভবন প্রভৃতি। এসব সরকারি ভবন ছাড়াও সিলেট মহানগরীতে এশিয়া মার্কেট, নেহার মার্কেট, সুরমা মার্কেট, মধুবন মার্কেট, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়, মিতালী মার্কেট, রহমান ম্যানসন সহ অসংখ্য ব্যক্তি মালিকানাধীন সুউচ্চ ভবন ভূকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৮৯৭ সালে সিলেট সহ আসামে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পে সিলেট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের ডিন প্রফেসর ড. মোস্তাক আহমদ জানিয়েছেন, ঘন ঘন ভূমিকম্প দুই ধরনের বার্তা জানান দেয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। আরেকটি হচ্ছে- ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আতঙ্কও কেটে যায়। তিনি জানান, সিলেটবাসীকে এই মুহূর্তে সচেতন হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। বিশেষ করে সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন। প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে ডাউকী ফল্ট এলোমেলো হলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সিলেটে এক সঙ্গে ৫ বার ভূমিকম্প হয়ে গেছে। এ নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। বিশেষ করে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিভাগকে এ নিয়ে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। তিনি বলেন, সবার আগে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। ভূমিকম্প হলে হুড়োহুড়ি না করতে তিনি নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

mzamin

Comments
Loading...