বিশ্বে নিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান তলানিতে

0 ১৬

বিশ্বে নিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান তলানির দিকে। সম্প্রতি ৬০টি শহরের বিভিন্ন দিক পর‌্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। ওই সূচক অনুযায়ী ৬০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ৫৪তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ঢাকার নিচে রয়েছে শুধু পাকিস্তানের করাচি। ডিজিটাল নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, অবকাঠামো, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা বিবেচনা করে এ সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে।

৩১ অক্টোবর (রোববার) বিশ্ব শহর দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জাতিসংঘ ঘোষিত দিবসটি নানা কর্মসূচিতে পালন করা হবে। যত কর্মসূচিই পালন করা হোক, নিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য নগর নিয়ে আসতে ব্যক্তি নিরাপত্তাসহ যাবতীয় সেবা নিশ্চিত করার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি

নগরীতে বসবাসের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আগের চেয়ে ঢাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও এখনো থেমে নেই চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। হরহামেশাই এসব ঘটনার খবর মিলছে। দুর্বৃত্তরা সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত নিরিবিলি সড়ক, ফ্লাইওভার, লঞ্চ ও বাস টার্মিনালের আশপাশের এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতি করে বেড়ায়। ছিনতাইকারী এতটাই বেপরোয়া যে, তারা খুন করতেও দ্বিধা করছে না। ঘটনার স্বীকার হয়ে থানা-পুলিশেও জড়াতে চান না অনেকে ভুক্তভোগী।

তবে পুলিশের ভাষ্যমতে, চুরি-ছিনতাই আগের চেয়ে অনেক কমেছে। শহরজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় এসব অপরাধ অতীতের চেয়ে কমেছে এবং অপরাধীও ধরা পড়ছে। অভিযোগ কিংবা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত তিন বছরে রাজধানীতে ছিনতাই হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এসব ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রাণ গেছে বেশ কয়েকজনের, আহতও হয়েছেন অনেকে।



র‌্যাব-পুলিশের ড্রেসে টার্গেট করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে সম্প্রতি জব্দ হওয়া সরঞ্জাম

২০২০ সালে ছিনতাইয়ের (দ্রুত বিচার আইনে) মামলা হয় ৮৭১টি। আগের বছর ২০১৯ সালে এ মামলার সংখ্যা ছিল ৫৩১টি। এ হিসাবে ২০১৯ সালের তুলনায় পরের বছর ছিনতাই মামলা বেড়েছে ৩৪০টি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ছিনতাইয়ের ঘটনা মামলার হিসাবের চেয়ে বেশি, যার কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া বহু ঘটনা নীরবে হজম করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে রাজধানীর ৫০টি থানায় চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি সংক্রান্ত মোট মামলা হয়েছে এক হাজার ২৯১টি। এর মধ্যে ডাকাতির মামলা ১৬টি, দস্যুতার ৮৩টি, (ছিনতাই) দ্রুত বিচার আইনে ৫৭টি, সিঁধেল চুরির ৩৭৭টি এবং অন্যান্য চুরির মামলা হয়েছে ৭৫৮টি।

ডিএমপি সূত্র জানায়, সবশেষ সেপ্টেম্বরে ঢাকার ৫০ থানায় দস্যুতার মামলা হয় ১৬টি, ডাকাতির একটি, ছিনতাইয়ের তিনটি এবং চুরির মামলা হয় ১৪৯টি।

ক্রমেই বাড়তে থাকা মামলা থেকেই ধারণা করা যায়, রাজধানীতে কীভাবে বাড়ছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ। এর মধ্যে নিম্নোক্ত কয়েকটি ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে।

র‌্যাব-পুলিশের ড্রেসে টাকাওয়ালাদের টার্গেট, হাতকড়া পরিয়ে লুট

ব্যাংক থেকে মোটা অংকের টাকা তোলা ব্যক্তিদের টার্গেট করে ঢাকায় সক্রিয় একটি চক্র। এই চক্রের লোকেরা প্রথমে টার্গেটকে অনুসরণ শুরু করে। পথে সুবিধাজনক স্থানে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে টার্গেটকে নিজেদের গাড়িতে তুলে নেয়। শেষ ধাপে মারধর করে কেড়ে নেওয়া হয় টাকা। এমন এক চক্রের নয় সদস্যকে গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও মতিঝিল এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে একটি ওয়াকিটকি, একটি পিস্তল, এক জোড়া হাতকড়া, ট্রাভেল ব্যাগ, দুটি জ্যাকেট, চারটি নতুন গামছা, একটি প্রাইভেটকার, একটি মাইক্রোবাস ও পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়।

ডিবি জানায়, ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় ভুয়া র‌্যাব ও ভুয়া ডিবি পরিচয় দিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়া অথবা ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারী ব্যক্তিদের জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিচ্ছিল চক্রটি। এরপর তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও তাদের ডেবিট, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে হাতিয়ে নিতো চক্রের সদস্যরা।



গত ১৬ অক্টোবর রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে ডাকাত চক্রের তিনজনকে গ্রেফতার করে ডিবি

চক্রের টার্গেট বিদেশফেরত প্রবাসীরা

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর গত ৭ সেপ্টেম্বর মিশর থেকে দেশে আসেন লিটন সরকার। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। এ সময় কয়েকজন লোক ধারালো চাকুর ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে থাকা হ্যান্ডব্যাগ ও লাগেজ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। হ্যান্ডব্যাগ ও লাগেজে ছিল পাসপোর্ট, মিশরের ভিসা, ফ্লাইটের টিকিট, স্বর্ণের চেন, দুটি মোবাইল সেট, একটি স্মার্টকার্ড ও নগদ ৪০ হাজার টাকা। পরে ওই চক্রের সদস্যরা লিটন সরকারকে ঘটনাস্থল থেকে একটি বাসে তুলে এ বিষয়ে কাউকে না জানানোর জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি দিতে থাকে।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেন লিটন সরকার। মামলার তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তর বিভাগ। এরপর গত ১৬ অক্টোবর রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল থানাধীন মীরবাগ এলাকা থেকে ডাকাত চক্রের তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।

লক ভেঙে গাড়ি চুরির পর নম্বরপ্লেট পরিবর্তন

মুহূর্তেই যে কোনো গাড়ির লক ভাঙা কিংবা বিকল্প চাবি ব্যবহার করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চুরি করতো একটি চক্র। এমনকি গাড়ি শনাক্তের জিপিএস ট্র‌্যাকিং ডিভাইসও বিকল করে গাড়ি নিয়ে পালাতো তারা। এরপর গাড়ির মালিককে ফোন করে অর্থ হাতিয়ে নিতো অথবা গাড়িটি বিক্রি করে দিতো তারা। গত ১১ আগস্ট এমন একটি গাড়ি চোর চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

র‌্যাব জানায়, গত তিন বছরে এ চক্রের সদস্যরা শতাধিক গাড়ি চুরি করেছে। গ্রেফতার এড়াতে চক্রটি বাটন মোবাইল ব্যবহার করতো। এছাড়া একটি মোবাইল তারা পাঁচদিনের বেশি ব্যবহার করতো না এবং রাতে ঘুমানোর সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইলগুলো এক কিলোমিটার দূরে রেখে ঘুমাতেন।

ছিনতাইয়ে বাধা দিলেই খুন

মাসিক ১১ হাজার টাকা বেতনে ঢাকার আশুলিয়ার শিমুলতলার দি ভাই ভাই ফার্নিচারে কাজ করতেন রমজান মিয়া (১৯)। গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে কাজ শেষে ওই এলাকার মোল্লা বাজারের ভাড়া বাসায় ফিরছিলেন তিনি। পথে পলমল গার্মেন্টসের সামনে পৌঁছালে তার কাছে থাকা মোবাইল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ছিনতাইকারীরা। রমজান মিয়া কষ্টার্জিত টাকায় কেনা মোবাইল ও টাকা না দিলে ছিনতাইকারীরা ধারালো ছুরি দিয়ে তার বুকে ও পেটে জখম করে এবং সরু রড দিয়ে গলায় আঘাত করে। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করে তাকে সেখানে ফেলে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

গত ১৮ অক্টোবর এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার তিনজন ওই এলাকাসহ আশপাশ এলাকায় গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত রাস্তায় চলাচলকারী পথচারীদের টার্গেট করে তাদের গতিরোধ করে ছিনতাই করতো। কেউ তাদের ছিনতাই কাজে বাধা দিলে ধারালো ছুরি, লোহার রড দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যেতো। এতে জখম ব্যক্তির প্রাণহানিও ঘটতো।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

নগরের অপরাধ কর্মকাণ্ড নির্মূলে সম্প্রতি নগরবাসীকে সচেতন করার পাশাপাশি থানার মোবাইল টিম ও চেকপোস্টে ডিউটি বাড়ানোর নির্দেশ দেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মোহা. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, গামছা পার্টি, সালাম পার্টি ও টানা পার্টির অপরাধ নিরসনে আমাদের আরও সচেতন থাকতে হবে।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, আমাদের মূল দায়িত্ব অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। অপরাধের শিকার কারা হচ্ছে, কখন হচ্ছে এবং কী কারণে হচ্ছে তার সঠিক কারণ নির্ণয় করতে হবে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করুন। ঢাকা শহরের অপরাধ প্রতিরোধে সবাইকে আরও নিরলসভাবে কাজ করতে হবে।

জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, রাজধানী থেকে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই নির্মূল করার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের আটটি ক্রাইম ডিভিশন ও ডিবির আটটি ডিভিশন যৌথভাবে কাজ করছে। এসব ডিভিশনকে ডিএমপি কমিশনার কড়াভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন রাজধানী থেকে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই নির্মূল হয়ে যায়।

তিনি বলেন, আমাদের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ভাসমান মাদকাসক্ত। যখন তাদের কাছে মাদক কেনার টাকা থাকে না তখনই তারা মোবাইল ছিনিয়ে নিচ্ছে ও পকেট থেকে টান মেরে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতিরোধে পুলিশের ক্রাইম বিভাগের পেট্রোল টিম ও ডিবির ছিনতাই প্রতিরোধ টিম রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করে। সেসব পয়েন্ট থেকে নিয়মিত এসব অপরাধীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু ছিনতাইকারী গ্রেফতার হচ্ছে। গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এ ধরনের চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই যেন না বাড়ে তার জন্য কমিশনার মহোদয়ের কঠোর নির্দেশনা আছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরের যুগ্ম-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, হাতে ওয়ারলেস সেট, গায়ে র‌্যাব, ডিবি ও পুলিশের জ্যাকেট পরা দেখলেই তাদের পুলিশ বা র‌্যাব মনে করার কোনো কারণ নেই। তাদের যাচাই করুন। তারা সত্যিকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কি না তা নিশ্চিত হয়ে কথা বলুন। প্রয়োজনে মানুষ জড়ো করুন। প্রয়োজনে নিকটস্থ থানা পুলিশ বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিন।

হারুন অর রশীদ আরও বলেন, ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের পর অনেকেই মনে করে জানে বেঁচে গেছি, শুকরিয়া। এ নিয়ে আর কোনো অভিযোগ করবেন না। আমরা বলতে চাই, ছিনতাই কিংবা ডাকাতির শিকার হওয়ার পর কাছের থানায় অভিযোগ করবেন। যদি থানা অভিযোগ না নেয় তাহলে সরাসরি ডিবি কার‌্যালয়ে চলে আসবেন। ডিবিতে অভিযোগ দেওয়ার পর অন্তত কিছুদিন সময় নিয়ে হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উৎসঃ   জাগোনিউজ
Comments
Loading...