সিলেটে করোনায় যে কারণে অস্বস্তি

সীমান্তে কম, নগরে বেশি

0 ৭১

গোয়াইনঘাটের অর্ধশতাধিক গ্রাম সীমান্ত লাগোয়া। এপারে বাংলাদেশিদের ঘরবাড়ি, ওপারে ভারতীয়দের বসতবাড়ি। হাঁক দিলেই মেলে জবাব। এমন দূরত্বে অবস্থানের পরও
গোয়াইনঘাট সীমান্তে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ভয় নেই। কিংবা গণহারে উপসর্গ ও আক্রান্ত নেই। স্থানীয়দের মতে- ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। ওখানকার প্রশাসন শুরু থেকেই করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে সতর্ক থাকায় আপাতত সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী কয়েক গ্রামের বাসিন্দা করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে স্বস্তিতে আছেন। সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের টিএইচও ডা. রায়হান উদ্দিন জানিয়েছেন- করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে এখনো দুশ্চিন্তা নেই।

আক্রান্তের হারও কম। সীমান্ত এলাকার মানুষ সতর্ক থাকার কারণে সেটি সম্ভব হয়েছে। বিয়ানীবাজারের অর্ধশতাধিক গ্রামও ভারত সীমান্ত লাগোয়া। ওপারে আসামের ঘরবাড়ি, এপারে বাংলাদেশের মানুষের বসতবাড়ি। এমনও আছে দু’দেশের বাসিন্দারের খুব কাছাকাছি বাড়িঘর। বিয়ানীবাজার সীমান্তের ওই গ্রামগুলোতেও এখনো নেই করোনার ভয়। উপসর্গ এবং আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম। বিয়ানীবাজারের ওই সীমান্ত হচ্ছে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ এলাকা। আসামেরও সিলেট ঘেঁষা ওই অঞ্চলগুলোতেও ব্যাপক হারে ছড়ায়নি করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট। ফলে বিয়ানীবাজারেও এক ধরনের স্বস্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন টিএইচও ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন খান। তিনি জানান, সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কী না সে বিষয়েও তারা সতর্ক। সিলেট সীমান্তে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট যাতে প্রবেশ করতে না পারে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে আগে থেকেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ কারণে হয়তো আপাতত স্বস্তি। কিন্তু সিলেটে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে মোটেও সুখবর দিতে পারছেন না স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। দিন দিন তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্রমাগত সিলেটে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে- সিলেটে করোনা সংক্রমণের হার বর্তমানে ১৬ শতাংশের ওপর। কখনো কখনো এই শতাংশ আরো বেড়ে যায়। মৃত্যুর হারও প্রায় ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত দুই মাস ধরে একই ধারায় রয়েছে সিলেটের করোনা পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত ১০ দিনে সিলেটে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ২২ জন। এর মধ্যে ২১ জনই সিলেট জেলার। এছাড়া গত ৮ দিনে ৩ হাজার ৮০০ নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৭৫ জন। যা কোনোভাবেই স্বস্তির খবর নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মোজয় দত্ত জানিয়েছেন- ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে হয়তো সিলেটে স্বস্তি আছে, কিন্তু সিলেটে করোনা আক্রান্তের হার নিয়ে কোনোভাবেই স্বস্তি মিলছে না। এখন আক্রান্ত হচ্ছে ১৬ শতাংশের উপরে। সবকিছু খোলা থাকায় ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট সীমান্ত ছাড়া অন্য কোথাও দিয়ে সিলেটে প্রবেশের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। যদি এমন হয় তাহলে সত্যি সেটি হবে দুঃখজনক। তিনি বলেন, সিলেটের মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি কম পরিলক্ষিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে মাস্ক পরাও ছেড়ে দিচ্ছে মানুষ। অথচ এই মুহূর্তে সিলেটে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগের এক ভার্চ্যুয়্যাল সেমিনারে সিলেট নগর ও আশপাশ এলাকার করোনা পরিস্থিতির বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে- করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সিলেট নগর ও আশপাশ এলাকা। উপজেলাগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও নগরে বেড়েই চলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে সিলেট নগরী। এতে আসতে পারে লকডাউনের চিন্তাভাবনাও। সুতরাং সিলেট নগর ও আশপাশ এলাকার করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন থেকেই সতর্ক থাকার পরামর্শ স্বাস্থ্য বিভাগের মনিটরিংয়ে থাকা কর্মকর্তাদের। সিলেট বিভাগে রোগীদের জন্য একমাত্র ভরসা হচ্ছে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল। এ হাসপাতালটি ১০০ শয্যার। হাসপাতালের আরএমও ডা. সুশান্ত কুমার মহাপাত্র গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, শামসুদ্দিনে সব মিলিয়ে ৬৪ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালে ১৬টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এই বেডগুলো সবসময় রোগীতে পরিপূর্ণ থাকে। তাদের হাসপাতালে করোনার সঙ্গে মূল লড়াই আইসিইউতে হচ্ছে। চালু হওয়ার পর থেকে এখনো আইসিইউর একটি বেড শূন্য হয়নি বলে জানান তিনি। এদিকে, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীর জন্য ৬টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এসব বেডেও রোগী ভর্তি। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সিলেটে করোনা রোগী বাড়লে প্রস্তুতি রয়েছে। ওসমানীতে ২০০ শয্যার একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড যেকোনো সময় চালু করা সম্ভব হবে। এদিকে, করোনা রোগী বাড়লে সিলেটের খাদিমপাড়া ৩১ শয্যা ও দক্ষিণ সুরমার আরো ৩১ শয্যার হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে খোদ অস্বস্তিতে আছে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে- করোনা আক্রান্ত সীমান্তবর্তী এলাকা রাজশাহী, রংপুর থেকে প্রতিদিনই আসছে আম ও নানা ফলজ পণ্য। এছাড়া সবজি ও মাছ আসছে। মানুষও যাতায়াত করছে। ফলে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে শঙ্কা আছে সিলেটে।

mzamin

Comments
Loading...