গুম-অপহরণ, তদন্তের নামে কালক্ষেপণ

0 ২৩

10054_1বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে নাগরিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার নতুন আতঙ্ক অপহরণ বা গুম। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গুম ও অপহরণের মতো অপকর্ম জোরেশোরে শুরু হলেও তা পূর্ণমাত্রা পায় সরকারের গত মেয়াদের শেষ সময়ে। একের পর এক রাজনৈতিক গুম-অপহরণ রাজনৈতিক অঙ্গন ছেড়ে তা এখন সাধারণের মনেও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলেই নয়, হালে এ আতঙ্ক ছড়িয়েছে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও।

আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে আলোচিত অনেক গুমের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক নেতা কর্মী ছাড়াও ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, নারী এমনকি শিশুরাও অপহরণ বা গুমের শিকার হচ্ছেন।

যে কোনো স্থান থেকে যে কেউই যখন তখন গুম হয়ে যাচ্ছেন। অপহরণ হয়ে যাচ্ছেন। এ সব ঘটনার শিকার অধিকাংশরাই আর ফিরে আসেন না। জীবিত আছেন না হত্যা করা হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান সরকারের আমলে খুন ও গুমের ঘটনা নজিরবিহীন ভাবে বেড়ে গেছে এবং রাজনৈতিক কারণেই এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এর সাথে সরকার ও সরকারি পাণ্ডা বাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। অপহরণ ও গুমের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পেশাজীবী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে কোনঠাসা করতে চাইছে সরকার।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গুম ও খুনের ঘটনা ঘটছে তবে এর পেছনে রাজনৈতিক কারণের চাইতে সামাজিক অন্যান্য কারণই বেশি দায়ী।

পুলিশ সদর দপ্তরের গত ৫ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে গুম আর অপহরণের ঘটনায় ৪ হাজার ২৫০টি মামলা ও জিডি হয়েছে। এসব ঘটনায় সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি একটাও। বছরের পর বছর গুম আর অপহরণের ঘটনার তদন্তের নামে কালক্ষেপন করা হচ্ছে।

তবে গুম আর অপহরণে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে কালক্ষেপনের অভিযোগ তুলে অবিলম্বে গুম হওয়া স্বজনদের খুঁজে আনা ও অপহরণকারীদের বিচারের দাবি জানানো হলেও সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বরাবর ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলে আলোচিত অপহরণ ও গুমের ঘটনার কয়েকটি হলো-

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণ

সিলেটের বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ রয়েছেন দু’বছর ধরে। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ অপহৃত হন এই বিএনপি নেতা।

শোকাহত স্ত্রী তাহসিনা রুশদী বলেন, রাজনৈতিক কারণেই তার স্বামী বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে ‘গুম’ করা হয়েছে। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন তাকে (ইলিয়াস আলী) উদ্ধারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন। কিন্তু সে আশ্বাস আশ্বাসই থেকে গেছে। রাষ্ট্র সহযোগিতা না করলে কী-ই বা করার আছে।

বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম

অপহরণের শিকার হন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। নিখোঁজ হওয়ার পর এখনো তাকে পাওয়া যায়নি।

ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাচা অপহরণ

একইভাবে বেশ কয়েক জন রাজনৈতিক নেতা অপহৃত হওয়ার পর তারা এখনও উদ্ধার হয়নি। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানা বিএনপির সভাপতি ও করলডেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাচা অপহরণের পর খোঁজ মেলেনি। অপহৃতের পরিবারের দাবি র্যা ব সদস্যরা তাকে ঢাকার গাজীপুর থেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে।

ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল আলম অপহরণ

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নেলাইন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল আলম ঢাকার পল্টন থেকে নিখোঁজ হন ২০১১ সালের ৬ মার্চ। ওই ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় পল্টনসহ কয়েকটি থানায়। মাসের পর মাস চলে তদন্ত। কিন্তু ফিরে আসেননি শহীদুল। তিনি বেঁচে  আছেন নাকি মেরে ফেলা হয়েছে তা নিশ্চিত নন তাঁর পরিবার। পুলিশও উদ্ঘাটন করতে পারছে না নিখোঁজ রহস্য।

বিএনপি নেতা ইকবাল মাহমুদ জুয়েল অপহরণ

‘গত বছরের ১২ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর চকবাজার জামে মসজিদের সামনে থেকে র্যাকব পরিচয় দিয়ে কিছু লোক ওষুধ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বিএনপি নেতা ইকবাল মাহমুদ জুয়েল অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগ, র্যা ব পরিচয়ে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় থানায় জিডি হলেও সন্ধান মেলেনি জুয়েলের।

স্ত্রী মনোয়ারা বেগমের দাবি, ‘বিএনপির রাজনীতি করত বলে স্বামী গুম করা হয়েছে।  দুই মেয়ে এক ছেলে বাবার জন্য অপেক্ষা করছেন। মনোয়ার বেগম বলেন, ‘সন্তানদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে চলেছি।

খুলনার কে এম শামীম আকতার গুম

খুলনার কে এম শামীম আকতারকে ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় র্যা ব পরিচয়ে অপহরণ করা হয় ঢাকা থেকে। ওই দিনই পল্টন থানায় জিডি করেন শামীমের স্ত্রী ঝর্ণা খানম। কিন্তু শামীমের কোনো হদিস মিলছে না। স্ত্রী ঝর্ণা খানম বলেন, ‘সন্তান বাবার কথা জানতে চাইলে কিছুই বলতে পারি না। তিনি (স্বামী) বেঁচে আছেন, নাকি তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে তাও জানি না।’

যুবলীগ নেতা পারভেজ অপহরণ

নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজকে গুলশান থেকে অপহরণ করা হয় গত বছরের ৬ জুলাই। এ ঘটনায় গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তার স্ত্রী সোহানা আক্তার।

কিন্তু এখনো পর্যন্ত পারভেজকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি এ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি সরকারের কোনো সংস্থা।

স্কুল ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি অপহরণ  অত:পর  হত্যা

গত বছরের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি। দু’দিন পর ৮ মার্চ  শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার হয় তার লাশ। ত্বকি শহরের চাষাঢ়ার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন।

ত্বকি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্রে সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরি ওসমানসহ ১২ জন অভিযুক্ত করা হলেও তারা রয়ে গেছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। বাবা রফিউর রাব্বীর ওপর প্রতিশোধ নিতেই ছেলেকে হত্যা করা বলে তদন্তে বের হয়ে এসেছে।

অপরদিকে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আশিকুর রহমান, নাট্যকার দিদারুল ইসলাম চঞ্চল সবশেষে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি, আলোচিত এ তিনটি হত্যাকান্ড একই সূত্র গাঁথা বলে ধারণা করছেন নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। আর ৩ জনের মৃত্যুর ধরনও অনেকটা একই রকমের। নিখোঁজের পর তাদের সবার লাশ মিলেছে শীতলক্ষ্যা নদীতে। কিন্তু আজো অধরা রয়েছে নেপথ্যের খুনি ও খুনের কারণ।

সর্বশেষ আবু বকর ও আজিজুল হক অপহরণ

অপহরণ বা গুমের ঘটনায় সর্বশেষ শিকার বিশিষ্ট পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় কর্মী আজিজুল হক।

এদের মধ্যে আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণ করা হয়েছে গত বুধবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে তার নিজের গাড়ীতে ঢাকা ফেরার পথে। আর আজিজুলকে অপহরণ করা হয়েছে একই দিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে।

গত বুধবার আনুমানিক বিকাল পৌনে ৩ টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে ভূঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে অস্ত্রের মুখে দুর্বৃত্তরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায়।

আবু বকরের স্ত্রী রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘তার পেশাগত কাজে ক্ষিপ্ত হয়ে কেউ তার স্বামীকে অপহরণ করেছে। তিনি বলেন, আমার পেশাগত কর্মকাণ্ডে বসুন্ধরা, মধুমতি, আশিয়ান, শিপ ব্রেকারসহ কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠি চরমভাবে ক্ষুব্ধ। তারাই হয়ত পরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে অপহরণ করেছে।’

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ৫ বছরে সারা দেশে অপহরণের ঘটনায় দেড় সহস্রাধিক মামলা ও জিডির তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অপহরণের পর থানায় মামলা বা জিডি হলে কিছুদিন ভালোভাবেই তদন্ত চলে। পরে আর তদন্তই হয় না।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘আমাদের দলের লোকও অপহৃত হচ্ছে। এক শ্রেণীর দুর্বৃত্ত অপহরণ করে পুলিশ-র্যা বের ওপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে। যারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের কিছুতেই ছাড় দেয়া হবে না।’

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে যত দিন পুলিশ-র্যা ব ব্যবহৃত হবে তত দিন অপহরণ ও গুম চলতেই থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জড়িত বলে বারবার অভিযোগ উঠছে।’ তিনি বলেন, রাষ্ট্রের উচিত নিখোঁজ, গুম বা অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে হবে। নইলে সরকারকে একদিন জনগেণের কাঠগড়ায় দাড়াতেই হবে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘গুমের ঘটনা রোধ করতে না পারলে বিপদে পড়তে হবে সরকারকেই। র্যা ব-পুলিশের নাম ব্যবহার করে যে গুম হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে যত শীঘ্র সম্ভব। অপহরণ বা গুমের ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।’

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়া, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ- সব মিলিয়ে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মানুষ চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন ২০১৩-তে এই দাবি করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে সংগঠনটি বলছে, বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে। ২০১৩ সালে পুলিশ, র্যা বসহ বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ৩২৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়। ৫ বছরে এই সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। এর মধ্যে পুলিশের হাতে সর্বোচ্চ ১৭৫ জন এই হত্যার শিকার হয়। ২০০৯ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা ছিল ১৫৪।

২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের জড়িত থাকার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০১৩ সালে তারা ১১ জনকে হত্যা করেছে বলে জানাগেছে।

Comments
Loading...