চামড়ার দাম কমানোর সিন্ডিকেট!

0 ১৩

Sceen_132816189ঢাকা: চামড়ার দাম নির্ধারণ নিয়ে তিন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা সিন্ডিকেট তৈরি করছেন। অভিযোগ ওঠেছে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে যে দাম ঘোষণা করা হয়েছে তা বর্তমানে দেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে চামড়ার চাহিদা বাড়ার পরও গতবারের চেয়ে এবার চামড়ার কম দাম ঘোষণা করেছেন তারা।

এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও চামড়ার মালিকেরা অনেক আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হবেন। শুক্রবার তিন ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে চলতি মৌসুমের কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ, আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে ওইসব অভিযোগ ওঠে আসে।

‘আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম ও ডলারের দাম পড়ে গেছে। তাই এবার চামড়ার দাম কম হবে।’– এহেন অজুহাতে গতবারের চেয়ে শতকরা ১৫ ভাগ টাকা কমে চামড়ার দাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইলিয়াস হোসেন বাংলানিউজকে জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম এ তথ্য সঠিক নয়। আর ডলারের মূল্যও কমে যায় নি স্থিতিশীল রয়েছে।

তিনি বলেন, বাজারে কয়েক ধরনের চামড়া রয়েছে। এর মধ্য চলতি বছরে এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত এক-দুটি চামড়ার দাম কিছুটা কমেছিল। কিন্তু আগস্ট মাস থেকে আবার তা বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশের চামড়ার চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, চীন প্রায় ৫০ ভাগ চামড়াজাত পণ্য নিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি তারা যেসব দেশে কম পারিশ্রামিকের শ্রম রয়েছে সেসব দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভবনা আছে।

এছাড়া জাপান, তুরস্ক, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চামড়া রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ হিসাবে চামড়ার কদর কিন্তু বাড়ছে।

ড. ইলিয়াস হোসেন আরও বলেন, অনেকদিন ধরেই চামড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দাম নিয়ে সিন্ডিকেট করে আসছেন। এভাবে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ওই সিন্ডিকেটের কর্তারা। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

তৃণমূল পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও আর্থিক সহযোগিতা দিলে সিন্ডিকেট থেকে অনেকটা বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সংগঠনের সহ-সভাপতি নবী হোসেন বলেন, যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে তার চেয়ে এখন বাজারে বেশি দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে গরুর লবণযুক্ত চামড়া প্রতিবর্গফুট ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং খাসির চামড়া ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান বাজারের সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্য নেই ব্যবসায়ী নেতাদের বেঁধে দেয়া দামের।

প্রায় ৪২ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলানিউজকে বলেন, যে দাম ব্যবসায়ী নেতারা ঘোষণা করেছেন সেই দামে তারা নিজেরাই চামড়া কিনতে পারবেন না এবং কিনবেন না। শুধু চামড়ার মালিক, সাধারণ ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতিতে পড়বেন।

তিনি দাবি করেন, দেশের স্বার্থে সরকারের উচিত এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। সরকার কত টাকা ঋৃণ দিচ্ছে তা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে তার পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে। তাছাড়া নিজেদের মতো করেই এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে আর লোকসানে পড়বে সরকার।

তৃণমূল ব্যবসায়ী ও নাটোর জেলা চামড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান জানান, কোরবানির পশুর চামড়া সবচেয়ে ভালো মানের হয়। তাই এর দামও বেশি হয়ে থাকে। যে দাম ঘোষণা করা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে চামড়া বেচাকেনা হবে বলে মনে করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. সাইদুর রহমান সেলিম এই প্রতিবেদককে বলেন, চামড়া ব্যবসায়ীদের নিজেদের মতো করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। ইন্টারনেটে চামড়ার বাজারের পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। এছাড়া আমাদের একটি টিমও থাকবে সবকিছু পর্যবেক্ষণের জন্য।

এসময়ে তিনি জানান, গত অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে এক হাজার ২৯৫ মিলিয়ন ডলার। যা গত ২০১২-১৩ অর্থবছরের চেয়ে শতকরা ৩২ ভাগ বেশি। এবার প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন ডলার আয় হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহম্মেদ জানান, অনেকেই অনেক কথা বলতে পারেন। কিন্তু আমাদের ব্যবসা আমাদেরই করতে হবে। কোনটা ভালো হবে সেটা ভেবেই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকা ঠিক নয়।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের মূল্যের ওপর নির্ভর করে গতবারের চেয়ে কম দাম ঘোষণা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সারা বছরের মধ্য অর্ধেক চামড়াই আসে কোরবানির পশুর চামড়া থেকে। তাই এ সময়ে চামড়ার দাম নির্ধারণ, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদের সঙ্গে চামড়ার দাম নির্ধারণ বিষয়ে বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ৩ অক্টোবরের মধ্য মন্ত্রী চামড়ার দাম নির্ধারিত করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন ব্যবসায়ীদের। শুক্রবার ছিল শেষ দিন।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত চামড়ার দাম ওঠানামা করার কথা উল্লেখ করে উপস্থিত ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী সরাসরি নির্দেশ দেন দাম নির্ধারণ করার জন্য।

শুক্রবার সকাল সাড়ে দশটায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে চামড়ার দাম নির্ধারণের ঘোষণা দেয়া হয়।

এসময় বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিনস মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন চামড়ার দাম নির্ধারণ করে।

গতবার লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ঢাকার মধ্যে প্রতিবর্গফুট ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, বাইরে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। এবার ঢাকার মধ্য প্রতিবর্গফুট ৭০ থেকে ৭৫ এবং বাইরে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।  এছাড়া খাসির চামড়ার দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। চলতি মৌসুমে ঠিক করা হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

Comments
Loading...