দিল্লির মসনদে মোদি, প্রাপ্ত ফলাফল : এনডিএ-৩৩৯ (বিজেপি-২৮৪) ; ইউপিএ-৫৮ (কংগ্রেস-৪৪) ; অন্যান্য-১৪৬

0
modi2ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জন করেছে। মোদিঝড়ে খড়-কুটোর মতো উড়ে গেল কংগ্রেস। মোদির নেতৃত্বের ক্যারিশমায় পনেরো বছর পর দিল্লির মসনদ ফিরে পেল বিজেপি। এবার জোটসঙ্গীদের ওপর ভরসা করে নয়, ২৮৪টি আসনে জয়লাভ করে একক গরিষ্ঠতা নিয়েই দিল্লি দখল করল দলটি। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পেয়েছে ৩৩৯টি আসন। অন্য দিকে কংগ্রেস ও তার জোটসঙ্গীরা পেয়েছে ৫৮টি আসন। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৪৪টি আসন। সাতটি রাজ্যে কংগ্রেস কোনো আসনই পায়নি। এ ছাড়া কোনো রাজ্যেই কংগ্রেস আসন লাভের ক্ষেত্রে দুই অঙ্কে পৌঁছতে পারেনি। এই দুই জোটের বাইরের দলগুলো পেয়েছে ১৪৬টি আসন। ৩৭টি আসন পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে তামিলনাড়–র মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার দল এআইএডিএমকে এবং ৩৪ আসন পেয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আলোচিত দল আম আদমি পার্টি পেয়েছে ৪টি আসন। তবে কেজরিওয়াল পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের দায় স্বীকার করে নিয়ে বিজেপি ও মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মনমোহন সিং আজ তার বিদায়ী ভাষণ দেবেন। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি নির্বাচনে বিজয়ী দলকে আজ সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। খবর পিটিআই, টিএনএন, এনডিটিভি, আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য সূত্রের।
বুথ ফেরত সমীক্ষাই সঠিক হলো : গত ১২ মে নবম ও শেষ দফার নির্বাচন শেষে বুথ ফেরত সমীক্ষায় বিজেপি তথা এনডিএ’র বিজয়ের যে আভাস দেয়া হয়েছিল বাস্তবেও তাই ঘটল। বরং সমীক্ষার ফলাফলে কংগ্রেস ও ইউপিএ’কে যতগুলো আসন দেয়া হয়েছিল ফল প্রকাশের পর দেখা গেল যে তারা সেই আসনও পায়নি। বিজেপির সব সিনিয়র নেতাই বিপুল ব্যবধানে জিতেছেন। একমাত্র পরাজিত প্রভাবশালী নেতা হলেন অরুণ জেটলি। তিনি অমৃতসর আসনে পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংয়ের কাছে হেরেছেন। অন্য দিকে কংগ্রেসের এমন ধপাস পতন বা শোচনীয় পরাজয় স্বাধীনতার পর আর হয়নি। মোদিঝড়ের মধ্যে কোনোক্রমে রাহুল-সোনিয়া গান্ধী জিতলেও হেরেছেন স্পিকার মীরা কুমারসহ একাধিক মন্ত্রী ও দলের শীর্ষ নেতা।
মোদিকে বিশ্ব নেতাদের অভিনন্দন : বিশ্ব নেতৃবৃন্দও মোদিকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও শ্রীলঙ্কার প্রসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে মোদিকে অভিনন্দন জানিয়ে দেশ দু’টি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মোদিকে টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর অফিস ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে ক্যামেরন-মোদি ফোনালাপ হয়। ফোনালাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভারতের সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনকে ইতিহাসের বৃহৎ গণতান্ত্রিক নির্বাচন মন্তব্য করে নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগেরও প্রশংসা করেন। টেলিফোন করায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনকে ধন্যবাদ জানিয়ে মোদি বলেন, ব্রিটেন সফরে প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো আমন্ত্রণ তিনি সানন্দচিত্তে গ্রহণ করবেন। ফোনালাপে দুই নেতা ব্রিটিশ-ভারত পারস্পরিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে একযোগে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সরকার গঠনের প্রস্তুতি : নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। আজ বিজেপিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। ২১ মে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন নরেন্দ্র মোদি। তার নতুন সরকার শপথ নিতে পারে ২২ মে। ষোড়শ লোকসভা শুরু হবে ২৭ মে। ২৯ মে’র মধ্যে শপথ নেবেন নবনির্বাচিত সদস্যরা। স্পিকার নির্বাচন করা হবে ২ জুন। ৪ জুন যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি
সামনে শুভ দিন : মোদি
‘ভারত জিতে গেছে, সামনে কেবল শুভ দিন’-গতকাল লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর গুজরাটের ভাদোদরায় আয়োজিত বিজয় র‌্যালিতে এ কথা বলেন মোদি। এই শুভ দিন আনার সুযোগ করে দেয়ার কৃতিত্ব জনগণকে দিলেন ভারতের হবু প্রধানমন্ত্রী।
মোদি বলেন, মনোনয়ন জমা দেয়ার পর আমি কেবল আপনাদের ৫০ মিনিট সময় দিয়েছি, আর আপনারা আমাকে দিয়েছেন পাঁচ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি ভোট। তিনি বলেন, এই জয় জনতার, এই জয় ভারতের। সামনে শুভ দিন, এই শুভ দিন আনার সুযোগ করে দেয়ার কীর্তি জনগণের। থআমি এখানে এসেছি কেবল জনতাকে স্যালুট ও কৃতজ্ঞতা জানাতে। তিনি আরো বলেন, গণমাধ্যম চেয়েছিল আমি কিছু বলি, কিন্তু আমি এ দিনটির অপোয় ছিলাম। জনতাকে ধন্যবাদ আমার ধৈর্যের পুরস্কার দেয়ায়।
মোদি ও বিজেপিকে অভিনন্দন সোনিয়া-রাহুলের : নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ের দায় স্বীকার করেছেন দলের প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী। একইসাথে নতুন সরকার গঠনে ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) অভিনন্দন জানিয়েছেন তারা। শুক্রবার নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিকেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন কংগ্রেসের দুই কর্ণধার।
প্রথমে রাহুল গান্ধী বলেন, কংগ্রেস অনেক খারাপ ফল করেছে। দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি এর দায় নিচ্ছি। এ ফলাফল নিয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিত। এর পর সোনিয়া গান্ধী বলেন, আমি বিজেপির নেতৃত্বে গঠন হতে যাওয়া নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছি, একইসাথে এ পরাজয়ের জন্য দলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায় নিচ্ছি। সোনিয়া বলেন, আমরা যেভাবে প্রত্যাশা করেছিলাম সেভাবে সমর্থন পাইনি। তবে জয়-পরাজয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। আমরা জনমতকে শ্রদ্ধা জানাই। এ ছাড়া, জাতীয় ঐক্যের েেত্র নতুন সরকার কোনো আপস করবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বামফ্রন্টেরও ভরাডুবি : লোকসভা নির্বাচনে মমতা ও মোদিঝড়ে বামফ্রন্টেরও অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার মুখে। শেষ দফার ভোটগ্রহণের পর ভারতের বেশ কিছু মিডিয়া তাদের বুথ-ফেরত সমীায় ইঙ্গিত দিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ১০-১৫টি আসন পেতে পারে। কিন্তু ভোটের ফল ঘোষণার পর উল্টে গেল সব হিসাব-নিকাশ। বামফ্রন্ট জিতেছে মাত্র দু’টি আসনে। এই ফলাফলে চরম হতাশা ছড়িয়ে পড়ে বামফ্রন্টের নেতাকর্মীদের মধ্যে। এই ফলাফল তাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। দলের কেন্দ্রীয় সম্পাদক প্রকাশ কারাত শুক্রবার দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বামফ্রন্টের পরাজয়ের জন্য পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক সন্ত্রাস ও কারচুপিকে দায়ী করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট মতায় আসে ১৯৭৭ সালে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারকে পরাজিত করে। তারপর যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তার সব ক’টিতেই বামফ্রন্ট ভালো ফল করেছে। ২০০৯ সালে মমতা-ঝড়ে খারাপ ফল করলেও তারা ১৫টি আসন পায়। মমতার তৃণমূল কংগ্রেস পায় ১৮টি আসন। কিন্তু এবার মাত্র দু’টি আসন পাওয়ায় হতবাক বামফ্রন্টের নেতারা।
কয়েকটি আঞ্চলিক দলের শোচনীয় পরাজয় : এবারের নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি দলের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দলিত নেত্রী কুমারী মায়াবতীর দল বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) ২০০৯ সালের নির্বাচনে লোকসভা নির্বাচনে ২১টি আসন পেলেও এবার একটিও পায়নি। এমন ফল মায়াবতীর জন্য বিরাট আঘাত। কেননা আগামীতে তিনি এই রাজ্যে আবারো ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। একইভাবে মুলায়ম সিং যাদবের দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি) গত নির্বাচনে ২১টি আসন পেলেও এবার পেয়েছে ৭টি আসন। তামিলনাড়–তে ডিএমকে গত নির্বাচনে ১৮টি আসন পেলেও এবার একটি আসনও পায়নি। দলটি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ’র শরিক। বামফ্রন্টের শরিক সিপিআই গত লোকসভায় ৪টি আসন পেয়েছিল কিন্তু এবার একটিও পায়নি। এ ছাড়া মহারাষ্ট্রে রাজ থ্যাকারের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা, জম্মু-কাশ্মিরে ফারুক আবদুল্লাহর ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং আসাম গণপরিষদ একটি আসনও পায়নি।
প্রধান বিরোধী দল হতে তৈরি কংগ্রেস : নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের আভাস পেয়ে গিয়েছিল কংগ্রেস নেতৃত্ব। তাই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগেই কংগ্রেসের তরফ থেকে জানিয়ে দিয়েছিল যে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে তারা তৈরি। কংগ্রেসের মুখপাত্র অভিষেক সিংভি জানিয়েছেন, প্রধান বিরোধী দল হিসেবে লোকসভায় আসন গ্রহণ করতে তারা তৈরি। তিনি আরো জানান, আগামী দিনে কংগ্রেস যে আবার স্বমহিমায় ফিরে আসতে পারবে সে ব্যাপারে তারা যথেষ্ট আশাবাদী। দলের এই শোচনীয় হারের পেছনে ১০-১২টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী দিনে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে।
Comments
Loading...