যে কান্না কখনো শেষ হওয়ার নয়

0 ১৩

photo_gallery_14_448ঢাকা: সেদিন আকাশ ছিল কালো মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি হয়েছিল মধ্যরাতে। প্রকৃতি জানতো জনকের রক্তস্রোতে ভাসবে বাংলাদেশ। সেই মেঘ-বৃষ্টির অন্ধকার রাতে বেরিয়ে আসে ঘাতকের দল। ভোরের আলো ফোটার আগেই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে রচনা করে ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়।

তারা সপরিবারে সংহার করেছিল বাঙালির স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের স্রষ্টাকে। যিনি আঁধারে দিয়েছেন আলো, তাকেই হত্যা করে ওরা অমানিশার অন্ধকারে ঢেকে দিল গোটা দেশ। তার অপমৃত্যু জাতির করুণ ট্র্যাজেডি।

১৫ আগস্ট ধানমণ্ডির বাসভবনে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রাণ হারান তার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তাদের তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, নবীন সেনা অফিসার লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল, নবপরিণীতা দুই পুত্রবধূ ক্রীড়াবিদ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ মুক্তিযোদ্ধা শেখ নাসের, ভগি্নপতি পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশু পৌত্র সুকান্ত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তার স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্দীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, রিন্টুসহ পবিরারের ১৮ জন সদস্য।

এ ছাড়া নিহত হন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল ও বাসভবনের পাহারায় নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীরা। তবে প্রবাসে থাকায় সেদিন প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আজ(শুক্রবার) সরকারি ছুটি। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। দেশে ও বিদেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। তোলা হবে কালো পতাকা। সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে এবং ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হবে।

সারা দিন টুঙ্গিপাড়া ও ধানমণ্ডিতে নামবে মানুষের ঢল। জাতির জনকের অমর স্মৃতির উদ্দেশে অর্পিত হবে প্রাণ উজাড় করা শ্রদ্ধাঞ্জলি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে এই শহীদদেরও।

অভিশপ্ত এই দিনটিতে বাঙালি জাতির ললাটে যে কলঙ্কতিলক পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দীর্ঘ ৩৪ বছরেরও বেশি সময় পর সেই কলঙ্ক থেকে জাতির দায়মুক্তি ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার চূড়ান্ত বিচারের রায় অনুযায়ী ওই দিন মধ্যরাতের পর ৫ খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জাতির জনক হত্যা, ষড়যন্ত্র এবং অবৈধ ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য ও তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাঙালির বিজয়ের অভিযাত্রাও আরেক ধাপ এগিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিবসটি পালনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।

আজ সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর নিম্ন আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় ঘোষণা করে ১৫ জন সাবেক সেনা সদস্যের মৃত্যুদ আদেশ দেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল উচ্চ আদালত ১২ জনের মৃত্যুদ অনুমোদন করেন।

আবারও বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছরেও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের আপিল শুনানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা আদালতে ওঠে। অতঃপর বাকি থাকে বিচার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপের কাজ।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে সেই চূড়ান্ত বিচারের কাজটিই শুরু হয়। বিচার শেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে আটক ৫ খুনি লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা এবং মেজর (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পলাতক থাকায় আরও ছয় খুনি লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খোন্দকার আবদুর রশীদ, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, লে. কর্নেল (অব.) নূর চৌধুরী, মেজর (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) শরফুদ্দিন আহমেদ ডালিম এবং রিসালদার (অব.) মোসলেম উদ্দিনের ফাঁসির রায় এখনও কার্যকর করা যায়নি। মৃত্যুদ প্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে বাকি আসামি লে. কর্নেল (অব.) আবদুল আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে আগেই মারা গেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর এই হত্যার বিচার যেমন হয়নি, তেমনি তার শাহাদাতবার্ষিকীও পালিত হয়নি রাষ্ট্রীয়ভাবে।

১৯৭৫ সালের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শোকাবহ ১৫ আগস্ট পালিত হয়েছে। প্রথম ২১ বছর দিবসটি অতিবাহিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় অবহেলায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ৬ বছর দিবসটি পালিত হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে জাতীয় শোক দিবস বাতিল করে। তবে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার জাতীয় শোক দিবস এবং সরকারি ছুটি পুনর্বহাল করে।

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় দণ্ডিত পলাতক ছয় খুনিকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগে কোনো অগ্রগতি নেই। এ সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের দৃশ্যমান তেমন কোন উদোগ নেই।

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক রয়েছেন। অপর পলাতক আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এমএইচবি নূর চৌধুরী পালিয়ে আছেন কানাডায়।

কিন্তু দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় কানাডা তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে না। অন্য আসামিদের অবস্থানের বিষয়ে সরকারের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয় যে, তাদের অন্তত দু’জন ভারতে পালিয়ে থাকতে পারেন। এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

Comments
Loading...