রাজনীতিতে নয়া মেরুকরনের আভাষঃ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারণ সম্পন্ন !

0 ৩১

delhiশেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিহাস গবেষণা, মরহুম জাতীয় রাজনীতিবিদদের প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং জনগণের মৌলিক সমস্যা থেকে দূরে চলে যাওয়ার ঘূর্ণাবর্তে পড়েছে। শেখ মুজিব পরিবারের একচেটিয়া আধিপত্যের বিপক্ষে জনগণ যখন ফুঁসে উঠতে শুরু করে রাজনীতি ও সংগ্রাম অদৃশ্য হাতের ইশারায় বার বার থমকে দাঁড়ায়। হারিয়ে যায় জনগণের কাঙ্ক্ষিত মুক্তির লড়াই। এরপরে দৃশ্যপটে জিয়া পরিবারের পুনর্জাগরন। ইতিহাসের চাপা পড়া ঝাঁপি খুলে দেয়া হল জিয়ার উত্তরসূরির হাতে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দৃশ্যপটে যোগ হয়েছে আরও একটি পরিবার; বাংলাদেশের প্রথম প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পরিবার। ইতিহাসে পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কষে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করার আবেগময় গবেষণাধর্মী প্রকল্প। কিন্তু স্পষ্ট হয়ে পড়েছে একটি নয়া মেরুকরনের সম্ভাব্য রূপরেখা, যা রাজনৈতিক অংকের হিসেবে শেখ মুজিব পরিবারের উত্তরাধিকার হাসিনা ওয়াজেদের ভাগ্য নির্ধারণ সম্পন্নের ইঙ্গিত।

রূপরেখাটির কলেবর এখনো দৃশ্যমান না হলেও আরও কয়েকটি পরিবারের উত্তরসূরিরা সহসাই যোগ হতে পারেন ইতিহাসে না পাওয়ার স্বীকৃতি নিয়ে। ততক্ষন জাতিকে হয়তো অপেক্ষা করতে হবে। তবে একথা এখন বলা চলে শুন্য জন সমর্থনের কারনে শেখ মুজিব পরিবারকে টিকিয়ে রেখে যে নিজেদের স্বার্থ বাংলাদেশে টিকিয়ে রাখা যাবে না এটা দিল্লি অনুধাবন করেছে অনেক আগেই। দিল্লির এককালের অতি বিশ্বস্ত তাজউদ্দিন আহমদের পরিবারের আবির্ভাব দিল্লির এই অনুধাবনকে পরিস্কার করে দিয়েছে। বেশ কয়েকদিন আগে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান হাসিনা সরকারের মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফও মিডিয়ার সামনে বলে দিয়েছেন যে তিনি মরহুম জিয়াউর রহমানের ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমু সহ তোফায়েল আহমেদ, মরহুম আব্দুর রাজ্জাক, মরহুম আব্দুল জলিলকেই শুধু নয় মরহুম শেখ ফজলুল হক মণি, শেখ মুজিবের ভাই শেখ নাসেরের উত্তরাধিকারদেরও মসনদের চারপাশে ঘেঁষতেই শুধু বাঁধা দিয়ে রাখেন নাই, তাদেরকে বেইজ্জতিও করেছেন সমানভাবে। কিন্তু দিল্লির আস্থাভাজন এই বিশাল গোষ্ঠীগুলোকে দিল্লি চুপচাপ রেখেছিল পরবর্তীতে পরিবর্তিত সময়ে কাজে লাগানোর জন্য। মাওলানা ভাসানির পরিবার, মশিউর রহমান যাদু মিয়ার পরিবার, শেরে বাংলার পরিবার, পন্নী পরিবারসহ আরও অনেক পরিবার রয়েছে, তবে তাদের উত্তরাধিকারদের সবাইকে দিল্লি কাজে লাগাতে পারবে বলে মনে না হলেও; অনেক পরিবার যারা আওয়ামী পন্থীদের দিকে ঝুঁকবেন না, তারা ঠিকই জিয়া পরিবারের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। বিএনপি’র রাজনীতিতে দীর্ঘদিন উপেক্ষিত শহীদ জিয়ার নামটি রক্ষায় যেখানে বিএনপি’র একটি নুন্যতম আন্দোলনই হয়নি সেখানে জিয়াউর রহমানের ইতিহাস (অবশ্যই সত্য) নিয়ে দেশের রাজনীতির অবয়ব পরিবর্তনের ঝড় শুরু হলে অভিজ্ঞরাই দ্বিধায় পরে যান।  হাসিনার অবৈধ সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে না ঘোষণা দেয়ায় সবাই যেমন বেকুব বনে গিয়ে অংকের হিসেব মিলাতে পারছিলেন না; সেই তারাই তাজউদ্দিনের কন্যা শারমিনের কোথায় নড়ে চড়ে বসেন।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে গণ বিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনাকে রক্ষা না করলে বাংলাদেশ দিল্লির হাতছাড়া হতে পারে হিসেব করেই তাৎক্ষনিকভাবে আমির হোসেন আমু ও তোফায়েলকে সরকারে ঢুকিয়ে আওয়ামী লীগের পতন ঠেকানোর নামে দিল্লির দখলকে নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু নিজের সংকট উত্তরন দেখে অহংকার বেড়ে যাওয়া হাসিনার চরম গণবিরোধী অব্যাহত কর্মকাণ্ডে দিল্লি আবারো শংকিত হয়ে পড়ে। যেকোন ভাবেই হোক বাংলাদেশ তাদের কব্জায় রাখা চাই। প্রয়োজনে হাসিনা ওয়াজেদের যে কোন বিদায়ের পর্ব দিয়ে হলেও আপত্তি নেই তাদের। দিল্লি এটি নিশ্চিত হয়েছে হাসিনা যে কোন ভাবে উৎখাত হলেও জনগণের মধ্যে শোকরানা নামাজ আর কোরবানির ধুম পড়ে যাবে। যেমনটি হয়েছিল শেখ মুজিবের পতনের পরে। সেদিনের আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় ছিল কিন্তু তারাই কথা বলেছিল শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ও দিল্লির সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে এবারে যে রাজনৈতিক দাবার চাল চলছে তাতে বাংলাদেশে দিল্লির দখলদারিত্ব হারানোর ভয় একদম শুন্যের পর্যায়ে থাকবে। দিল্লির হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের দুটো বৈশিস্ঠ রয়েছে যা তাদের অনুকুলে যায়, এক- বাংলাদেশের জনগণ খুব সহসাই যে কোন ভয়াবহ ইতিহাসকেও ভুলে যায় এমনকি গনহত্যাও। দুই- এরা নিজের শ্রেণীর বাইরের কারো দ্বারা শাসিত হতে পছন্দ করে, অর্থাৎ এরা প্রভু ভক্ত হতে চায়, সেবক চায় না। যদিও শিক্ষিত নতুন প্রজন্মটি কিছুটা সচেতন হলেও এদের মধ্যে উচ্চাকাংখাকে সহজেই ব্যবহার করা যায় বলে তাদের ধারনা। এই হিসেবগুলো মাথায় রেখেই নতুন মেরুকরন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই জাতির মধ্যে নৈতিকতার অবক্ষয় পুরোটাই সম্পন্ন করতে তারা সক্ষম হয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস। এর স্বপক্ষে এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে তারা নাস্তিক ও ইসলাম বিরোধী বানাতে পেড়েছে। বাংলাদেশে অবাধ যৌনতা ও অধিকারের নামে সামাজিক শিষ্টাচার ও বন্ধনকে পুরোটাই ভেংগে দিতে পেরেছে। ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে ব্রিটিশ দখলদারদের চেয়েও বেশী এবাদতমুখি করতে পেরেছে। রাজনৈতিক দলগুলোতে অনুগত ও মূর্খদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

এইবার শেখ মুজিব ও তার পরিবার দিল্লির জন্য আশীর্বাদ নয় তাদের দায় (liability) হয়ে দাঁড়ানোয় নানান পরিবারের উত্তরাধিকারদের ইতিহাসের আবর্তে সংঘবদ্ধ করছে জনগণের সমর্থনে পরিবর্তনের লক্ষ্যে। টার্গেট বাংলাদেশের সমতল ভুমিতে দখলদারিত্ব ও স্বার্থ বহাল রাখা। না হলে ভারত নামের রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব সংকট শুরু হবে ঐতিহাসিক কারনেই। বাংলার ভাগ্যাকাশে হাসিনার মত কালো মেঘের উপরে অন্ধকার আরও নিকশ কালো হচ্ছে। হাসিনার ভাগ্য রাজনীতি দিয়ে নাকি অরাজনৈতিক তা দেখা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব সহসাই আমুল পরিবর্তন হবে যেখানে ছিটকে পড়বেন দীর্ঘ দিনের পোড় খাওয়া অধিকাংশ প্রবীণেরা। নবীনদের অনভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাবে দিল্লি।

তবে ইতিহাসে দেখা গেছে কোন খেলাই একতরফা চলে না। প্রতিটি খেলায় অনেকেই নিজ নিজ ছকে অংশ নেয়। বাংলাদেশে এখন অনেক শক্তিরই স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার কারনে। তাই খেলা শুরু হলে শেষ হাসি কোন্ শক্তি হাসবে এটা এই মুহূর্তে নির্ধারণ করা না গেলেও খেলার কোন ফলাফলেই যে জনগণের স্বার্থ রক্ষা হবে না এটা নিশ্চিত করে বলা চলে। ক্ষমতার খেলায় জনগণের কখনোই লাভ হয় না বা হয়নি যদি না সেটি সত্যিকারের রেভ্যুলেশন (গণ বিপ্লব) হয়।

Comments
Loading...