সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগের শব্দ-বর্ণ সবটাই মিথ্যা

0 ৪১

masud binসাক্ষাতকারে পিরোজপুর জিয়ানগর উপজেলার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মাসুদ বিন সাঈদী

একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের নয়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর জিয়ানগর উপজেলার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মাসুদ বিন সাঈদী প্রাইমনিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের দাড়ি-কমা, শব্দ-বর্ণ সবটাই মিথ্যা, মিথ্যা এবং মিথ্যা।

প্রাইমনিউজের সৌজন্যে সংবাদ২৪.নেটের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানসম্মত কোরআনের পথে সাঈদীর দাওয়াতের কারণে অসংখ্য মানুষ আলোর পথের সন্ধান পেয়েছে। তাই আমার পিতা কোরআনের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।’

সাঈদী অর্ধশতাব্দীরও বেশী সময় ধরে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে মানুষের কাছে কুরআনের দাওয়াত দিচ্ছেন। দেশে-বিদেশে কোরআনের যে কালজয়ী তাফসীর পেশ ও বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তা নিঃসন্দেহে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিশাল সংযোজন।

নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান বা প্রতিনিধি হিসেবে এলাকার জনগণের জন্য আপনার করণীয় কি এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ সাঈদী বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার এখতিয়ারে সেবা করার যেসব বিষয় সম্পৃক্ত আছে আমি তা যথাসাধ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের সেবা করব। আমার পিতার প্রদর্শিত পথে অর্থ্যাৎ ইনসাফ পূর্ণ বণ্টনের মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন সাধন করার চেষ্টা করব। জনগণের সুখ-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়াবো ইনশাআল্লাহ।’

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় কিন্তু আপনি উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে জামায়াত সমর্থিত, আপনার এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে আপনার এবং সরকারের ভূমিকাকে কিভাবে দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সাঈদীপুত্র বলেন, ‘এলাকার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য জনগণ আমাকে নির্বাচিত করেছে। সুতরাং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আমার দায়িত্ব পালনে সরকার আমাকে সহযোগিতা করবে, এটাই সরকারের কাছে আমার ও জনগণের প্রত্যাশা।’

জামায়াত ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে দলটি নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া চলছে এ অবস্থায় জামায়াতের ভবিষাৎ কি হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। দলটি নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া চলছে মর্মে যেসব কথা বলা হচ্ছে তা জনগণ গ্রহণ করবে না। জামায়াতের গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণ ওয়াকিবহাল। সরকার এ দলটি নিষিদ্ধ করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তা জনগণের নিকট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার দায়িত্ব জনগণ এ সরকারকে দেয়নি। এমনকি এ সরকার জনগণের কাছে ঘোষিত তাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে এমন কোনো কথা বলেনি। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণই নির্ধারণ করবে কোন দলের রাজনীতি করবে করবে। সরকারি আদেশে বা নিষেধে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হতে পারেনা।

আপনার পিতার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ডকে কিভাবে দেখছেন, তিনি কি মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ সাঈদী বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা ন্যায় বিচার বঞ্চিত হয়েছি। আমার পিতা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার আমার পিতার জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে, তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছে। তাদের এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্যই তারা স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমার পিতার কন্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের দাড়ি-কমা, শব্দ-বর্ণ সবটাই মিথ্যা, মিথ্যা এবং মিথ্যা। ট্রাইব্যুনালে আমার পিতার বিরুদ্ধে যে দণ্ড দেওয়া হয়েছে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। যে দুটো অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তা যে শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যা তা জনগণের নিকট পরিস্কার। যেমন, প্রথম আমার পিতার বিরুদ্ধে কথিত প্রথম অভিযোগটি হল ইব্রাহিম কুট্টি হত্যাকাণ্ড। রায়ের দ্বিতীয় অভিযোগে রয়েছে বিশাবালি হত্যাকাণ্ড। তিনি বলেন, ‘ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলার এজাহারে আমার পিতার নাম ছিল না। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পিরোজপুর থানা পুলিশ এই মামলার চার্জশিট প্রদান করে। উক্ত চার্জশিটেও আমার পিতার নাম ছিল না। ডিফেন্সের সাক্ষি হিসেবে আমি নিজেই ট্র্ইাব্যুনালে এই মামলার ১৯৭২ সালের এজাহারের সার্টিফাইড কপি প্রদর্শন করেছি। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার ঘটনায় প্রসিকিউশন তাদের দাবির সমর্থনে স্ত্রী ও তার দুই সন্তান, তার শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা এমনকি তার পরিবারের সদস্য কিংবা ওই গ্রামে অর্থ্যাৎ নলবুনিয়া গ্রামের কাউকেই সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির করেনি।’

মাসুদ বলেন, ‘প্রসিকিউশন তাদের এই মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণের জন্য নলবুনিয়া গ্রামের কাউকে হাজির করতে না পেরে গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের ট্যাংরাখালি গ্রামের তিনজন ব্যাক্তিকে দিয়ে ট্রাইব্যুনালে স্বাক্ষী দিয়েয়েছে। যদিও তারা কেউই ইব্রাহীম কুট্টির আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু এনকি পরচিতও নন। ট্রাইব্যুনালে হাজিরকৃত তিনজনের দু’জন যথাক্রমে ট্যাংরাখালি গ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সেক্রেটারি এবং অপরজন কর্মী। দলীয় লোকদের দ্বারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে সরকার এই অভিযোগে আমার পিতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড হাসিল করেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘রায়ের দ্বিতীয় অভিযোগে রয়েছে বিশাবালি হত্যাকাণ্ড। বিশাবালী হত্যা মামলায় তার ভাই সুখরঞ্জন বালী সরকার পক্ষের মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন। তাকে আমার পিতার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে অত্যাচার-নির্যাতনও করা হয়। এরপরও তাকে রাজি করাতে না পেরে নগদ দেড় লাখ টাকা এবং একটি বাড়ি, একটি খামাড়ের অধীনে সরকারি সুবিধা দেওয়া হবে বলে প্রলোভন দেখানো হয়। পরে সুখরঞ্জন বালী আমার পিতার পক্ষে সাক্ষী দেওয়ার জন্য রাজী হলে ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। ঢাকায় কোনো একটি গোয়েন্দা সংস্থার দফতরে আটক রেখে মাসখানেক পর তাকে ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভারতের কারাগারে বন্দী সুখরঞ্জন বালী সাংবাদিকদের নিকট সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তাকে অপহরণের বর্ণনা দেন।

তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তাকে হুমকী দেওয়া হয়েছে যে, ‘সাঈদীকে তো ফাঁসি দেওয়া হবেই, তোকেও হত্যা করা হবে। এই রিপোর্ট ইংরেজী দৈনিক ‘নিউ এইজ’ পত্রিকায় ২০১৩ সালের ১৬ মে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরেরদিন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি জাতীয় এবং স্থানীয় পত্রিকায় এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল।

মাসুদ সাঈদী বলেন, ‘সুখরঞ্জন বালীর স্ত্রী আরতি বালী এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তার স্বামী সাঈদী সাহেবের পক্ষে সত্য সাক্ষ্য দিতে ২০১২ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকায় গিয়েছিলেন এবং ৫ তারিখ সুখরঞ্জন আদালতে গিয়েছিলেন সাক্ষ্য দিতে। কিন্তু আদালতের গেট থেকে তাকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই।’

তিনি বলেন, ‘সুখরঞ্জন বালী ও তার স্ত্রীর বক্তব্য মিডিয়াতে আসার পরও তাদের বক্তব্যকে আমলে না নিয়ে আমার পিতাকে কথিত এই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি বিষয়ে আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেটি হল, গত ২৩ মার্চ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে আমি জিয়ানগর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। আশ্চর্য বিষয় হল, আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে সরকার উত্থাপিত তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের সকল ঘটনা, ঘটনাস্থল, মামলার বাদী, মামলার সাক্ষী সবাই এই জিয়ানগর এলাকার অন্তর্ভূক্ত, যেখান থেকে আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। আমাকে জিয়ানগরের জনগণ তাদের ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করলো ঠিক তখন, যখন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমার পিতার বিরুদ্ধে পাহাড়সম মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার পিতাকে ফাঁসির আসামি বানিয়েছে। আমার পিতার বিরুদ্ধে কথিত বিচারের রায় এখন অপেক্ষমান। আমার পিতা যদি সত্যিই তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী হতেন তাহলে ওই এলাকারই জনগণ তার সন্তান হিসেবে আমাকে চেয়ারম্যান করাতো বহুদূরের কথা, একটি ভোটও দিতেন না।’

Comments
Loading...