আ.লীগ-জামায়াত মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ: ফরহাদ মজহার

0 ১৬

Forhadঢাকা: ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী এবং সেক্যুলার আওয়ামী লীগকে ‘একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, কবি ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার।

তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নামটা বিরাট একটা প্রতিবন্ধকতা আমাদের সমাজে তৈরি করেছে। ফলে তাদের এই নামটা নিজেদের বদলানোর দরকার ছিল। তো জামায়াতে ইসলামী যদি এই নামের পরিবর্তনটা নিজেরা না করে এবং আওয়ামী লীগ তাকে নিষিদ্ধ করে যদি সে কাজটা করে দেয় তাহলে খারাপ কি?

রেডিও তেহরানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, সরকার জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করবেই। আর এতে জামায়াতে ইসলামীর জন্য লাভ হবে। তবে ক্ষমতাসীনদের জন্য হবে মস্ত বোকামী।

পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো;

প্রশ্ন: জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ সাত ধরনের অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এনে তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এজন্য তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও অবলুপ্তি চেয়েছি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব অপরাধের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোই কি দলটিকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশের প্রধান কারণ- নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণও আছে?

উত্তর: বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করাটা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক অনিবার্য বিষয়। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর যে শক্তি সরকার দেখেছে তাতে তারা মনে করছে যদি জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করা হয় তাহলে আগামী দিনে শুধু জামায়াতে ইসলামী নয় ইসলামপন্থীদের আরো শক্তিশালী রাজনৈতিক উত্থান ঘটবে। তাছাড়া ক্ষমাতাসীনদের যে নির্যাতন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং বিএনপির ব্যর্থতা- এ দুটো মিলে স্বভাবত ইসলামপন্থীদের প্রতি জনগণের আগ্রহ ও প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে বাড়ছে। ফলে জনগণ তাদের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে।

সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে যা করছে তা আইন এবং রাজনীতি উভয় দিক থেকে বোকামী করছে বলে আমি মনে করি। কারণ, যে কোনো রাজনৈতিক বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে হলে তা রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। এটাকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা বা অন্য কোনোভাবে করলে তা ঠিক হবে না।

আপনার প্রশ্নের মধ্যে আপনি যে বিষয়টি এনেছেন যে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার  ক্ষেত্রে অন্য কোনো কিছু আছে কি না– এখানে অন্য কোনো কিছু বলতে কোনো ষড়যন্ত্র কিনা এ ধরনের বিষয় আছে বলে আমি মনে করি না। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা ছাড়া আর আর কোনো পথ নেই। তাদের আরেকটি যে পথ রয়েছে, সেটি হচ্ছে শুধুমাত্র সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে তারা শাসন করতে পারে। আর সম্ভাব্য যারা সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে তাদেরকে দমনের মাধ্যমে। আমি জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে এভাবে দেখতে চাই এবং সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করবে বলেই আমি মনে করি।

প্রশ্ন: জ্বি, আপনি তো রাজনৈতিক কারণে কথা বললেন। তো আপনি জানেন যে, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার ইস্যুটি বেশ কয়েক বছর আগে থেকে বর্তমান সরকার বলে আসছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটি সরকার এক রকম ঝুলিয়ে রেখেছে। তো আসলে কি সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চায়, নাকি এটি তাদের কোনো রাজনৈতিক কৌশল?

উত্তর: আমার মনে হয় একটা গুণগত পার্থক্য ঘটেছে। তবে আগে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের পর থেকেই জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করতে দেয়া আওয়ামী লীগের একটি কৌশল ছিল। জামায়াতের যে নাম অর্থাৎ যে কনটিউনিটি এক অর্থে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে। কারণ জামায়াতের বিপরীতেই আওয়ামী লীগের লেজিটিমিসি বা রাজনৈতিক বৈধতা গড়ে উঠেছে। ফলে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করা যাবে না। এ দুটি দলের ক্ষেত্রে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর কারণে বাংলাদেশে একটি ইসলামী রাজনীতির আবহ গড়ে উঠলেও এখানে পার্লামেন্টারি বলুন বা যেটাকে সোস্যাল ডেমোক্রেসি বলা হয় সে ধরনের একটি রাজনীতি গড়ে ওটা- এখানে কঠিন হয়ে গেছে। এর এটির কারণ হচ্ছে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা। আর এই বিবেচনায় আগে সরকার যদি কখনও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কথা বলে থাকে, সেটা তাদের কৌশল ছিল।

তবে এবার স্থানীয় সরকার বিশেষত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর জামায়াতের অবস্থানের দিক বিবেচনা করে তাদেরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কৌশল বলে আমার মনে হয় না। সরকার নীতিগতভাবে জামায়াতকে দমন করা ছাড়া আগামী দিনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। কারণ জামায়তে ইসলামীর শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থানকে কেন্দ্র করেই এখানে ইসলামী আন্দোলন বা অন্যান্য ইসলাপন্থীদলগুলো একত্রিত হতে পারে। তবে জামায়াতে ইসলামী ঠিক এভাবে ভাবছে কিনা তা আমি জানি না। তবে আমি মনে করি ক্ষমতাসীনরা এমন একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে। আর সে কারণেই আগেই সরকার রাজনৈতিকভাবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে চায়। তবে এটা কোনো সমাধান নয়। বরং আমি বলবো এটি ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে মস্ত বোকামী। আর যদি সরকার সেটা করে তাহলে বিষয়টি মূলত জামায়াতের পক্ষে যাবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো কোনো রাজনৈতিক দলকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অথচ দলটি নিষিদ্ধ করার জন্য সরকারের নির্বাহী আদেশই যথেষ্ট ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে- তা না করে সরকার কেন এই বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় এ কাজটি করতে যাচ্ছে?

উত্তর: দেখুন, নির্বাহী আদেশ বলুন কিংবা আইনি প্রক্রিয়া বলুন- কোনোভাবেই জনগণের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও প্রচারে সংগঠিত হওয়ার সমাবেশের নাগরিক অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণ্ন করতে পারে না। জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করাটা নাগরিক এবং মানবিক অধিকার বিরোধী অবস্থান। জামায়াতের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে থাকেন তার বিরুদ্ধে বিচার হতে পারে। কিন্তু দল হিসেবে একটি আদর্শ বা একটি সংগঠনকে আইনি প্রক্রিয়ায় বা নির্বাহী প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করা একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সরকারের এ ধরনের চিন্তার কোনো আইনি এবং রাষ্ট্রনৈতিক ভিত্তিও নেই, একই সঙ্গে যুক্তিও নেই।

আমাদের সমাজে যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক এবং লিবারেল মনে করেন, নাগরিক ও মানবাধিকার নিয়ে কথাবার্তা বলে থাকেন তারা এ ব্যাপারে কোনো কথা বলছে না। কারণ, তাদের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে একটা জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ কাজ করে। ১৯৭১ সালে যদি কেউ সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধ করে থাকে সেটা একটা বিষয়; কিন্তু যখন সরকার জামায়াতকে একই সঙ্গে দোষী করে তখন তারা ভুলে যায় যে শিবির বা জামায়াতের তরুণ কর্মী-সমর্থক যারা আছেন তারা কেউই ’৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেনি। তারা একটা একটি ইসলামী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই জামায়াতে ইসলামী করে।

যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, যারা কখনও আইনের শাসনের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনীতি করতে চায়নি বা করেনি তাকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা যায় না। কিসের ভিত্তিতে বা যুক্তিতে তাদের নিষিদ্ধ করবেন? ধরুন আমি জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দ করি না এবং ঘোরতর বিরোধী একইভাবে আমি আওয়ামী লীগকেও পছন্দ করি না এবং ঘোরতর আওয়ামী লীগ বিরোধী। তো সেক্ষেত্রে জামায়াত যদি নিষিদ্ধ হতে পারে তাহলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে না কেন? আওয়ামী লীগ মূলত জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বেশি সন্ত্রাসী। আওয়ামী লীগ পুরো রাষ্ট্রকে একটি সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

ফলে যদি সন্ত্রাসের ও অপরাধের কথা ধরা হয় এবং ’৭১ এ যদি ফিরে যাওয়া হয় তাহলে সে সময় অপরাধগুলো আসলে কারা করেছে সেটি খুঁজে দেখা দরকার। তখন অপরাধ কি শুধু জামায়াত একা করেছে! আর কি কেউ অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেনি? নিঃসন্দেহে অন্যান্যরা অপরাধ করেছে। যেহেতু বিজয়ীরা বিচার করে থাকে। সে কারণে আমাদের সংবিধানে আইন করা হয়েছে যে, মুক্তিযোদ্ধারা যদি এ রকম কোনো অপরাধ করে থাকে তবে তাদের ‘দায়মুক্তি’ দেয়া হবে। কিন্তু নৈতিকতার জায়গায় দাঁড়িয়ে যদি জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলা হয় সেক্ষেত্রে তাদের যুক্তি ধোপে টিকবে না। ফলে বিভক্ত করার সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক অজ্ঞতা রয়েছে।

এছাড়া দ্বিতীয় যে বিষয়টি রয়েছে সেটি হচ্ছে, এর সঙ্গে সরাসরি দিল্লির রাজনীতি জড়িত। কারণ দিল্লির নিরাপত্তার জন্য এবং বাংলাদেশের ওপর দিল্লির আধিপত্যের জন্য  বাংলাদেশকে বিভক্ত রাখাটাই জরুরি। আর এ ব্যাপারগুলো এতই স্পষ্ট যে, তা বোঝার জন্য খুব বড় বুদ্ধিজীবী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

আমি নৈতিকভাবে বলব- জামায়াতের যারা অপরাধ করেছেন তাদের বিচার করে শাস্তি দেয়া উচিত। কিন্তু আমরা যদি আইনের দ্বারা বা বিচারের দ্বারা জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চাই তাহলে যারা বিচারক আছেন তাদেরকে সাবধান হতে হবে। তাদেরকে অন্তত একটুখানি বিচক্ষণ হতে হবে যে, আইন যখন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে তখন আইন নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনে। আর সেই বিপদ এরই মধ্যে ‘আইসিটি’ তার কাঁধে তুলে নিয়েছে। সে বিপদ বাংলাদেশের আদালত তার কাঁধে তুলে নিয়েছে। এসব তো বিতর্কিত বিষয়। এখন এসবের কোনো সমাধান তো আমি দেখছি না। আমরা বুদ্ধিজীবীরা এ ব্যাপারে কথা বলতে পারি তবে সমাজ এ ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন না হলে এর সমাধান হবে না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়। অনেকে বর্তমান নীরবতাকে ছাইচাপা আগুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দল যাকে সরকার বিরোধী আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি বলে মনে করা হয় তাকে নিষিদ্ধ করা হলে পরিস্থিতি আরো সংকটাপন্ন হবে কি-না?

উত্তর: আমি আপনার এ প্রশ্নের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করছি। আমি মনে করি গত ৪২ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এত ভালো আর কখনও ছিল না। আমি বলবো বাংলাদেশের সংকটপূর্ণ ও বিতর্কিত অনেকগুলো বিষয় বর্তমানে স্পষ্ট হয়ে গেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত ফ্যাসিস্টদের একটি মতাদর্শ এ বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে অথচ তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ আগাগোড়াই এ দেশের ৯০ ভাগ মানুষের ধর্ম অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। বাংলাদেশের আলেম ওলামাদেরকে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বিচারে হত্যা করেছে। এসব ব্যাপার স্পষ্ট একটি জনমত, একটা সম্মতি তৈরি হয়েছে।

আমি মনে করি  এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট একটি জনমত তৈরি হওয়া রাজনৈতিক দিক থেকে বিরাট অগ্রসর হওয়া। গত ৪২ বছরে কিন্তু এটি হয়নি। আর এই সুস্পষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে না পারার পেছনে জামায়াতের ভূমিকাই প্রধান বলে আমি মনে করি। কারণ জামায়াতে ইসলামী তার নামটা ধরে রাখার কারণে এখানে একটি ইসলামী রাজনীতি গড়ে ওঠেছে।

আর এখানে ১৯৭১ সালটা বারবার আমাদের সামনে একটি বাধা হিসেবে হাজির হয়েছে। কিন্তু এখন আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ’৭১ এর চিন্তার যে ভারটা আমাদেরকে চাপিয়ে রেখেছিল তা থেকে এখন জনগণ মুক্ত হচ্ছে। আর সে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারটা আমরা দেখেছি মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর রায়ের সময় যেসব জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে তারা কিন্তু শুধু জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক বা লোক নয়। সে সময় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়ার পরও পুরো ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে। পুরো আইসিটির বিষয়টি বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত হয়ে আছে। ফলে আমি মনে করি রাজনৈতিক দিকে বাংলাদেশ একটা অসাধারণ জায়গায় এসে পৌঁছেছে। আর রাজনীতির দিক থেকে এটি খুবই ইতিবাচক বিষয়।

আর যে অর্থে হতাশাব্যাঞ্জক বলা হচ্ছে, সেটি হচ্ছে- বিএনপি সেই ধরনের রাজনীতি করতে পারেনি। ফলে এটি বিএনপির সমস্যা। বাংলাদেশের জনগণ বর্তমানের এই পরিস্থিতি মেনে নেবে বলে আমি মনে করি না। এখানে উদারনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো সুযোগ নেই। রাস্তার লোককে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। সেজন্য হয়তোবা জনগণ প্রতিবাদ করবে না; হয়তোবা তারা মেনে নেবে একটা সময়ের জন্য। হয়তো ১ বছর বা দুই বছর তারা এটা মেনে নেবে। কিন্তু তারপর আর নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির একটা গুণগত বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমার লেখাগুলোতে এ বিষয়টি আমি বারবার বলেছি। আর এই গুণগত পরিবর্তন রির্ভাস করার বা ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরনো ’৭১ এর বয়ান দ্বারা বর্তমানের রাজনীতিকে প্রভাবিত করা যাবে বলে আমি মনে করি না।

জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ তাদের সংকট সমাধান করতে পারবে বলে আমি মনে করি না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে আছে একমাত্র দিল্লির সমর্থনের ভিত্তিতে। সত্যিকার অর্থে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক কোনো সমর্থন নেই। আর দিল্লি যেহেতু সরাসরি আমাদের প্রতিবেশী এবং তারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করছে সে কারণে হয়তোবা বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক সমস্যাটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। তবে এটা দিল্লির জন্য খুব একটা ইতিবাচক হবে না। এটি দক্ষিণ এশীয়ায় একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করবে। এই পরিস্থিতিকে আমি খুব একটা নেতিবাচক বলে মনে করি না। তবে এ পরিস্থিতিতে বুদ্ধিজীবীদের উচিত জনগণকে গাইড করা।

প্রশ্ন: জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলে তাতে জামায়াতের লাভ বেশি হবে এমন কথা বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছে। তো সেটি কীভাবে সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: দেখুন, এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম লাভ হচ্ছে দলটিকে তার নাম বদলাতে হবে। জামায়াতে ইসলামী একটি লেগাসি (উত্তরাধিকার) ধারণ করে। আমার কাছে এটি এখনও বিস্ময়কর এবং প্রশ্নবোধক যে কেন এই নামটা জামায়াত রাখল!

বাংলাদেশে একটা ইতিবাচক ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজন রয়েছে। এদেশের ৯০ ভাগ মানুষ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। এখানে ইসলামী মূল্যবোধ এবং তার আদর্শগত দিকের প্রচারের দরকার আছে। ইসলামের দার্শনিক আলোচনার দরকার আছে। ইসলামকে সাংস্কৃতিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর দরকার আছে। সেক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর নামটা বিরাট একটা প্রতিবন্ধকতা আমাদের সমাজে তৈরি করেছে। ফলে তাদের এই নামটা নিজেদের বদলানোর দরকার ছিল। তো জামায়াতে ইসলামী যদি এই নামের পরিবর্তনটা নিজে না করে এবং আওয়ামী লীগ তাকে নিষিদ্ধ করে যদি সে কাজটা করে দেয় তাহলে খারাপ কি?

আমি তো মনে করি এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো দিক। আর এটি করলে জামায়াতের যারা রাজনীতি করছে তারা কি রাজনীতি ছেড়ে দেবে! জামায়াতের যারা সমর্থক তারা কি রাজনীতি ছেড়ে দেবে! আমি মনে করি না। যারা চায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে, সংস্কৃতির প্রশ্নে, এদেশের আত্মপরিচয়ের এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে এখানে একটি ইসলামী রাজনীতির আন্দোলন ঘটুক তারা কি রাজনীতি ছেড়ে দেবে! না, আমি মোটেও এমনটি মনে করি না। ফলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করাটা মূলত এদেশের রাজনীতির উদ্ভব বা নতুন করে আবির্ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।

Comments
Loading...