গণমাধ্যমের জন্য অভিন্ন নীতিমালা-আইন দাবি

0

22624_1সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় গণমাধ্যমের জন্য সমন্বিত নীতিমালা ও আইনের দাবি উঠে এসেছে; আলাদা নীতিমালা পরস্পরের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করবে বলেও মন্তব্য করছেন এক আলোচক।

রোববার ‘জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪: উদ্বেগ ও করণীয়’ শিরোনামে এই গোলটেবিলের আয়োজন করে ‘আর্টিকেল ১৯’।

অনুষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার বলেন, “২০১৪ সালে যখন আমরা একটি সম্প্রচার নীতিমালার কথা বলছি, তখন প্রযুক্তি আমাদেরকে ভিন্ন একটি জায়গায় নিয়ে এসেছে। এই সময়ে আমরা মিডিয়া বলতে সামগ্রিকভাবে যাকে বুঝি, তার জন্য একটি নীতিমালার কথা বলছি কি-না?

“আলাদা নীতিমালা কেন? তার মানে কাগজে কাউকে আমি গালি দিতে পারবো। কিন্তু অনলাইনে পারবো না? “এজন্যই আমাদের উচিত, একটি জাতীয় গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করা। পরে সেই আলোকে বাকি কাজগুলো করা।”

তিনি বলেন, “কাগজের পত্রিকার জন্য ওয়েজ বোর্ড আছে। টিভি সাংবাদিকের জন্য নাই কেন? ভবিষ্যতে অনলাইন সাংবাদিকতা যারা করবে, তাদের জন্য কেন থাকবে না? কাগজের পত্রিকার জন্য যদি প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট থাকে, তাহলে টিভির জন্য সম্প্রচার আইন খুঁজে বেড়াচ্ছি কেন?”

মোস্তফা জব্বার বলেন, “আমি মনে করি, সামগ্রিকভাবে মিডিয়ার জন্য একটি কমন প্লাটফর্ম দরকার। তাই সম্প্রচার কমিশন নয়, গণমাধ্যম কমিশন হওয়া উচিত। এটা করা হলে কমিশনের কাছে কাগজ-টিভি সবার বিষয়ে যেতে পারবো।

“একটি নীতিমালা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। অনলাইনের আরেকটি নীতিমালার খসড়া মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে।”

সম্প্রচার ও অনলাইন উভয় নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য বলেন, “আমাকে যখন বলা হলো, কমিটি অনলাইন নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করবে। আমি বললাম, আমার কাজ সহজ হবে।

“কিভাবে? সম্প্রচার নীতি থেকে অর্ধেক দেয়া যাবে।

“তার মানে অনলাইন নীতিমালা করতে গেলে গেলে আমাকে ভাবতে হচ্ছে, সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে। অনলাইনে সেই বিষয়গুলোর ৯৫ ভাগ প্রতিফলন করতে হবে। প্রযুক্তিগত পার্থক্য ছাড়া খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পাইনি।”

মোস্তফা জব্বার বলেন, “সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। আমরা কি আইসিটি অ্যাক্ট নিয়ে কথা বলেছি? এই আইনে কি পরিমাণ কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, সেটা সম্পর্কে কি আমরা সচেতন?

“আমরা কি আদৌ ৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট আছে, সেটা সম্পর্কে কোনো কথা বলেছি? সেই আইন যে আমার গলা টিপে ধরে রেখেছে, সেই আইন সম্পর্কে বলিনি।

“আমি কি বিশেষ ক্ষমতা আইন সম্পর্কে কথা বলেছি? সেই আইনতো আমার মাথাসহ উড়িয়ে নিয়ে গেছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলিনি। সম্প্রচার নীতিমালা সামনে এসেছে সে কারণে কিছু ভাসা ভাসা সংজ্ঞাগত আলোচনা করেছি।”

মোস্তফা জব্বার বলেন, “গণমাধ্যমের জন্য ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে একটি নীতিমালা, একটি কমিশন, একটি আইন করতে পারি। একইসঙ্গে আমি মনে করি, গণমাধ্যম আইন করে প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্টটা বাতিল করে দেন।

“একইসঙ্গে আমি মনে করি, লাইসেন্সের পলিসি যদি করেন, অবশ্যই ব্রডকাস্টের মাধ্যমের জন্য বিটিআরসির তরঙ্গ বরাদ্দে আলাদা ব্যবস্থা থাকতে পারে। ব্লগে কি লেখা হবে, সেটা আমি নিয়ন্ত্রণ করবো কি-না, এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কথা বলা উচিত বলে আমি মনে করি।”

মোস্তফা জব্বরের বক্তব্য প্রসঙ্গে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, “গণমাধ্যম নীতিমালার দাবিটি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন থেকে আমরা বলেছি। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন- আমরা এটা চাই। এর সঙ্গে আমরা একমত।”

তিনি বলেন, “সম্প্রচার নীতিমালাসহ আলাদা আলাদা নীতিমালা কনফ্লিক্টিং হবে। অনলাইন নীতিমালার খসড়া পড়ে আছে। আরও দুটি ড্রাফট পড়ে আছে। একটি হলো ১৯৭৪’র নিউজ পেপার সার্ভিসেস অ্যাক্ট যেটাতে কেবল সংবাদপত্রের কর্মচারীদের বিষয় ছিল। সেখানে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ঢুকানো হয়েছে।

“আপনারা বলছেন, সম্প্রচার কমিশনে কমপ্লেইন করবেন। তথ্য মন্ত্রণালয় কিন্তু আবার প্রেস কাউন্সিলে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অভিযোগ নেওয়ার জন্য আরেকটা খসড়া নিয়ে বসে আছে। কাজেই কোনটার সঙ্গে কোনটা মিলবে। একটি গণমাধ্যম নীতিমালা হলে সেটাই হওয়া উচিত।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমান অনুষ্ঠানে নিজের ফোনটি দেখিয়ে বলেন, এই এক মোবাইলে এখন টিভি দেখতে পারেন। অনলাইন দেখতে পারেন, পত্রিকা পড়তে পারেন।

“এছাড়া ভবিষ্যতের কোনো নতুন ধরণের মাধ্যমও এখানে যুক্ত হতে পারে। এ সব মিলিয়ে কেন নীতিমালা হচ্ছে না? এখন একটি সমন্বিত নীতিমালা করা দরকার।

“বিজ্ঞাপন নিয়ে শ্লীল-অশ্লীল নানা কথা বলা হয়েছে। অভিনয়ও একটা শিল্প, এটা নিয়েও কথা বলা যায়। যাত্রা-নাটক আলাদা একটা যোগাযোগ মাধ্যম, কিন্তু সেটা আবার উঠে আসছে টিভিতে। অনলাইনেও নানা ধরণের জিনিস আসছে।

“এর বাইরে রয়েছে, বিদেশি চ্যানেল। যেগুলো আমাদের সংস্কৃতিকে গ্রাস করে ফেলেছে। কিন্তু তাই বলে আমরা দরজা জানালা বন্ধ করে থাকতে পারবো না। একটার মধ্যে কি এগুলোও পড়বে না? সবগুলোকে কি এখানে নিয়ে আসবো না?”

তিনি বলেন, আলাদা আলাদা নীতিমালা ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে আসে। পরিকল্পনা সমন্বিত জায়গা থেকে করতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে করতে হবে। চাপিয়ে দেয়া নীতিমালা চলতে পারে না।

আর্টিকেল ১৯’র বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক তাহমিনা রহমানের সঞ্চালনায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া, ম্যাসলাইন মিডিয়া সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক কামরুল আহসান মঞ্জু, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা ও ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আলোচনায় অংশ নেন।

Comments
Loading...