প্রশ্নের উপর প্রশ্ন কতটা আসল ‘আসল বিএনপি’ ?

0

kamrul_hasan_nasimমামলা-গ্রেফতারে বিপর্যস্ত বিএনপি যখন সংকট কাটিয়ে উঠতে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তখন দলটির সামনে ‘উদ্ভট সমস্যা’ হয়ে দেখা দিয়েছে ‘আসল বিএনপি’।

নতুন এই সংগঠনও চাইছে বিএনপির পুনর্গঠন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নেতা মেনেই দলের বর্তমান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে দলের মধ্যে বিপ্লব ঘটাতে চান ‘আসল বিএনপির’ দাবিদার কামরুল হাসান নাসিম। তার দাবি ‘আসল বিএনপি’ কোটি মানুষের সংগঠন!

তবে বিএনপির মূলধারার সঙ্গে একবারেই যুক্ত না থাকা এই নেতার ‘আসল বিএনপি’ আসলে কতটুকু আসল, তা নিয়েও প্রশ্ন জাগছে জনগণের মধ্যে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কামরুল হাসান নাসিম ‘আসল বিএনপি’ গড়ার আগে ২০১০ সালে ‘গড়বো বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। বিএনপির প্রয়াত নেতা ওবায়েদুর রহমানের স্ত্রী শাহেদা ওবায়েদ ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ‘গড়বো বাংলাদেশ বিপ্লবী সংগঠনে’র পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে একসঙ্গে আলোচনায় অবসর দাবি করেন। ওই বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাদের অবসরের আলটিমেটাম দেওয়া হয়। এ সময় সংগঠনটির মুখপাত্র হিসেবে কথা বলেন কামরুল হাসান নাসিম।

‘আসল বিএনপি’র এই নেতা ‘জননেতা ডটকম’ নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের এডিটর ইন চিফ। সম্প্রতি বিএনপির ক্রান্তিকালীন রাজনীতির ‘মুখপাত্র’ দাবি করে খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত ‘আসল বিএনপি’ গড়ার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।

‘আসল বিএনপি’র মুখপাত্র কামরুল হাসান দাবি করেন, বিএনপি এখন আর জিয়াউর রহমানের আদর্শে নেই। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একক নেতৃত্বে দল পরিচালিত হয়। জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করছে বিএনপি। এই পরিস্থিতিতে বিএনপিকে ভেঙে গড়া দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

বিএনপিকে ঢেলে সাজাতে গত বছরের ২৬ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতীকী ‘জনতার আদালত’ করেন কামরুল হাসান। রাইজিংবিডিকে তিনি জানান, ওই আদালতে দুটি রায় এসেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বিএনপির গঠনতন্ত্র স্থগিত করা। অন্যটি নয়াপল্টনে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে জনতার উচ্চ আদালত বসানো। এর মাধ্যমে দলের বিপ্লব ঘটানো যাবে বলেও মনে করেন তিনি।

তবে ‘আসল বিএনপি’র এই কার্যক্রম মেনে নিতে পারছেন না বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এত দিন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ না ঘটালেও ২ জানুয়ারি ও ১৭ জানুয়ারি এর প্রতিফলন ঘটিয়েছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। রোববার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জনতার আদালত বসানোর জন্য ‘দলীয় বিপ্লবের মহড়া’ দিতে ‘আসল বিএনপি’র শতাধিক নেতা-কর্মী নয়াপল্টনে যান। এ সময় সেখানে থাকা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া খেয়ে তারা পালিয়ে যান। আর ‘আসল বিএনপি’র নিয়ে আসা একটি পিকআপ ভ্যানও জ্বালিয়ে দেয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। গত ২ জানুয়ারিও কার্যালয় দখল করতে এলে ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যান ‘আসল বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা। এ সময় সংগঠনটির অনেক কর্মীকে মারধর করা হয়।

তবে কামরুল হাসান নাসিম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য দলীয় বিপ্লব করতে চেয়েছি। সেই বিপ্লবের অংশ হিসেবে অফিসে যাওয়া-আসার মধ্যে থাকার জন্য কার্যালয়ে যেতে চেয়েছিল নেতা-কর্মীরা। কিন্তু তাদের মারধর করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া মা। ভুল করতেই পারেন। আমি তো আর সেই ভুল করতে চাই না। তিনি অছাত্রদের দিয়ে ছাত্রদল করেছেন। মূলত এখন তিনি ৩০ লক্ষ সুবিধাভোগীর নেত্রী। গবেষণা করে দেখেছি, আসল বিএনপি কোটি লোকের প্রতিনিধিত্ব করছে। আজ অথবা কাল উদ্যোক্তা হিসেবে এই দলকে অনেক ওপরে নিয়ে যেতে পারব।’

এদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তো নয়ই, তৃণমূল পর্যায়েরও কোনো সদস্য না হওয়ায় কামরুল হাসানের বিএনপির মধ্যে বিপ্লব ঘটনোর চেষ্টা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে ‘আসল বিএনপি’র এই ধরনের কার্যক্রমকে কোনো গুরুত্ব দিতে চান না বিএনপির নেতারা। দলটির কর্মী-সমর্থকরাও কামরুল হাসান নাসিমের এই কার্যক্রমে বেশ ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার কথাটি ভালো করে নেননি দলটির নেতা-কর্মীরা।

তবে বিএনপিকে নিয়ে ‘আসল বিএনপি’র এই ‘বাড়াবাড়ি’র নেপথ্যে সরকারের ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি। দলটির দাবি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের মদদে ‘আসল বিএনপি’ নামে এ সংগঠন এসব কর্মকাণ্ড করছে।

‘আসল বিএনপি’র কার্যক্রম শুধু অনভিপ্রেতই নয়, সরকারের নীলনকশার অংশ- এমনটি দাবি করে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আসল বিএনপি’ নামে একটি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বারবার বিএনপির কার্যালয় দখলের চেষ্টা সরকারের ‘হীন অপকৌশল ও অপকর্ম’।

তিনি বলেন, ‘সরকার যেহেতু গণবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সে জন্য বিভিন্ন ধরনের অন্যায়-অবিচারের পথ বেছে নিয়েছে। একদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের জুলুম-নির্যাতন করে ব্যতিব্যস্ত রাখছে, অন্যদিকে বিভিন্ন উপায়ে সাংগঠনিক কাজে বাধা দেওয়ার নাটক-ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’

সরকারকে উদ্দেশ করে রিজভী বলেন, ‘টোকাইদের ধরে নিয়ে এসে আরেকটি বিএনপি গঠনের চেষ্টা সফল হবে না। এই ধরনের ‘ছ্যাঁচড়া’ চেষ্টা মানুষ বিশ্বাস করবে না। এর আগে অনেকবার চেষ্টা করেছেন, সফল হননি। কারণ বিএনপি মেলামাইন বা চীনা মাটির তৈরি নয় যে ভেঙে যাবে। বিএনপি হচ্ছে ইস্পাত কঠিন জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য।’

বিএনপির শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমে বাধা দিতেই সরকার এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘সরকার যদি এই ধরনের কাজ অব্যাহত রাখে, তাহলে জনগণের আদালতে এর শাস্তি হবে ভয়ংকর। এই বিচারের যে রায় হবে তাতে আপনারা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবেন না।’

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More