৪০০ কোটির লক্ষ্যে আদায় ১৫ লাখ

0

অবলোপন করা ঋণের টাকাও আদায় হচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে শীর্ষ ১৯ ঋণ অবলোপনকারী এক টাকাও পরিশোধ করেনি। ফলে দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে সোনালী ব্যাংক। একদিকে শীর্ষ ২০ অবলোপনকারী ব্যাংক থেকে নিয়ে গেছে ২৭০০ কোটি টাকা। এরা টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এ কারণে নিয়মানুযায়ী ব্যাংককে ২৭০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) হিসাবে রাখতে হচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এমনই চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ২০ শীর্ষ ঋণ অবলোপনকারীর কাছে আটকে থাকা ২৭০০ কোটি টাকার মধ্যে এ বছর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪০০ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে মাত্র একজন ১৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। বাকি ১৯ জন কিছুই দেয়নি।

জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আফজাল করিম যুগান্তরকে বলেন, শীর্ষ ২০ অবলোপনকারী থেকে আদায় খুব বেশি নেই। তবে অন্যান্য অবলোপন থেকে আদায় হচ্ছে। আমি নতুন এসেছি। এসেই ১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে খেলাপি এবং অবলোপন থেকে আদায়ে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার সহজ এবং বৈধ পথ ঋণ অবলোপন। এতে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো দেখালেও অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক প্রতারিত হন। কারণ গ্রাহক ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারেন না।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শীর্ষ ১৯ ঋণ অবলোপনকারী থেকে ৯ মাসে এক টাকাও আদায় নেই, এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এতে করে ব্যাংকটি দুর্বল হয়ে যাবে। বিপুল অঙ্কের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাবে। এসব খেলাপি বা ঋণ অবলোপনকারীর কোনো জামানত থাকলে তা বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বড় ঋণখেলাপি বা অবলোপনকারীরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তাই তারা এ টাকা ফেরত দিতে চান না। অথচ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সবই চলছে। গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডিতে আলিশান বাড়ি। চড়েন দামি গাড়িতে। ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেন বিদেশে। দেশের বাইরে ভ্রমণ করেন বিমানের বিজনেস ক্লাসে। শুধু ব্যাংকের টাকা দিতে পারে না। এরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। টাকা আদায় করতে হলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সব সম্পদ কেড়ে নিতে হবে। সব অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করতে হবে। এক কথায়-কঠোর শাস্তি ছাড়া খেলাপি ঋণ আদায় হবে না। এছাড়া আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। তা না হলে আবার বেরিয়ে যাবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। শীর্ষ ১৯ ঋণ অবলোপনকারী থেকে ৯ মাসে এক টাকাও কেন আদায় হলো না। তাদের কোনো গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।

জানা গেছে, টানা তিন বছর যে খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হয় না। সে ঋণকে ব্যাংকের লেজার বুক থেকে বাদ দিয়ে অন্য একটি জায়গায় সংরক্ষণ করা হয়। একে ঋণ অবলোপন বলে। অবশ্য এর আগে অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা এবং অবলোপন করা ঋণের ওপর শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণ অবলোপনকারীর মধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল করপোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স হলমার্ক গ্রুপের কাছে পাওনা ১২২৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা। চলতি বছর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১৮৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে এক টাকাও ফেরত আসেনি। নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখার ৭টি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের (মেসার্স নিউ রাখী টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ১২৩ কোটি, মেসার্স সাহিল ফ্যাশন লিমিটেড ৮১ কোটি, মেসার্স ইউনিটি নিটওয়্যার লিমিটেড ৭১ কোটি, মেসার্স কেপিএফ টেক্সটাইল লিমিটেড প্রায় ৬৯ কোটি, মেসার্স মুন নিটওয়্যার প্রায় ৬৮ কোটি, মেসার্স সাহিল নিটওয়্যার লিমিটেড প্রায় ৫৮ কোটি এবং মেসার্স রানস অ্যাপারেলস ৪৭ কোটি টাকা) কাছে পাওনা ৫১৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯ মাসে ৬ প্রতিষ্ঠান এক টাকাও ফেরত দেয়নি। বাকি মেসার্স রানস অ্যাপারেলস ১৫ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখার দুই (মেসার্স জাসমির ভেজিটেবল অয়েল ১০৬ কোটি ও মেসার্স ইমাম ট্রেডার্সের ৮১ কোটি টাকা) গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ১৮৭ কোটি টাকা। গত ৯ মাসে এক টাকাও ফেরত আসেনি। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের লালদীঘি করপোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স সিদ্দিক ট্রেডার্সের কাছে পাওনা ৬৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কোনো টাকা ফেরত আসেনি। স্থানীয় কার্যালয়ের চার (মেসার্স ওয়ান স্পিনিং মিল ৯৪ কোটি, মেসার্স এ আর খান সাইজিং অ্যান্ড ফেব্রিকস ৬৫ কোটি ৫০ লাখ, যাদু স্পিনিং মিল ৫০ কোটি, মাস্ক সুয়েটার ৪৯ কোটি) গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ২৫৮ কোটি ৫০ লাখ এবং ঢাকার রমনা করপোরেট শাখার দুই (মেসার্স ফেয়ার এক্সপো ৯৬ কোটি ৩০ লাখ ও মেসার্স সুমি’স সোয়েটার ৭৬ কোটি টাকা) গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ১৭২ কোটি টাকা। গত ৯ মাসে এক টাকাও ফেরত আসেনি। এছাড়া যশোর করপোরেট শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলফা টোব্যাকো ৯৬ কোটি, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ করপোরেট শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইম্পেরিয়াল ডাইয়িং অ্যান্ড হোসিয়ারি ৮৯ কোটি এবং ফরিদপুর করপোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স রোকেয়া টেক্সটাইল মিলসের কাছে পাওনা প্রায় ৮৩ কোটি টাকা। গত ৯ মাসে এসব শীর্ষ ঋণখেলাপি এক টাকাও ফেরত দেয়নি।

jugantor

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More